“ভাবিদের জিম” বা “জুম্বা ক্লাস”, আজ সেটিই পরিণত হয়েছে শুদ্ধ নৃত্যচর্চার

অনেকে একে বলেছিল ভাবিদের জিম”

Feb 10, 2026 - 13:51
 0  2
“ভাবিদের জিম” বা “জুম্বা ক্লাস”, আজ সেটিই পরিণত হয়েছে শুদ্ধ নৃত্যচর্চার
অর্থী আহমেদ

“অনেকে একে বলেছিল ভাবিদের জিম”—নাচ, সংগ্রাম ও স্বীকৃতির গল্পে অর্থী আহমেদ

বিশেষ ফিচার প্রতিবেদন

একসময় যেটাকে হালকা করে বলা হয়েছিল “ভাবিদের জিম” বা “জুম্বা ক্লাস”, আজ সেটিই পরিণত হয়েছে শুদ্ধ নৃত্যচর্চার এক সম্মানজনক কেন্দ্র। আর সেই দীর্ঘ পথচলার নাম—অর্থী আহমেদ

মাত্র তিন বছর বয়সে নাচের তালিম শুরু। এরপর বছরের পর বছর কঠোর সাধনা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সামাজিক অবহেলা আর নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার গল্প মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য নৃত্যজীবন। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই চলতি বছর দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক পেয়েছেন তিনি।

শৈশব থেকেই নৃত্যের পথে

অর্থী আহমেদের নাচের শুরুটা ছিল একেবারেই পারিবারিক পরিবেশে। শিশুকাল থেকেই সংগীত ও ছন্দের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ রূপ নেয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে গভীর মনোনিবেশে।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তিনি ভরতনাট্যমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শুধু ডিগ্রি নয়, নৃত্যের দর্শন, শরীরী ভাষা ও মনস্তত্ত্ব নিয়েও তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় এই সময়েই।

নাচ শুধু শরীরচর্চা নয়, মনস্তত্ত্বও

নৃত্যকে কেবল শারীরিক অনুশীলনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি অর্থী। নাচের সঙ্গে মানুষের মানসিক গঠন, আবেগ ও আত্মবিশ্বাসের সম্পর্ক বুঝতে তিনি পাড়ি জমান ভারতের নৃত্যভূমি চেন্নাইয়ে। সেখানে তিনি ড্যান্স সাইকোলজি বিষয়ে শিক্ষকতার বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।

এই প্রশিক্ষণই তাঁর কাজকে আলাদা মাত্রা দেয়। অর্থীর কাছে নাচ মানে শুধু মুদ্রা বা তাল নয়—নাচ হলো আত্মপ্রকাশ, মানসিক সুস্থতা এবং নারীর নিজস্ব শক্তি ফিরে পাওয়ার মাধ্যম।

‘ভাবিদের জিম’ থেকে নৃত্য একাডেমি

চার বছর আগে নিজস্ব উদ্যোগে একটি নৃত্য একাডেমি গড়ে তোলেন অর্থী আহমেদ। শুরুতে সমাজের একাংশ বিষয়টিকে তাচ্ছিল্য করে দেখেছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন—এগুলো নাকি “ফিটনেস ক্লাস”, “জুম্বা” বা “ভাবিদের শরীরচর্চা”।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা ভেঙে পড়ে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শাস্ত্রীয় কাঠামো, মঞ্চায়ন ও গবেষণাধর্মী চর্চার মধ্য দিয়ে তাঁর একাডেমি আজ পরিচিত একটি গুরুতর নৃত্যকেন্দ্র হিসেবে।

বর্তমানে সেখানে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা ভরতনাট্যম শিখছেন—অনেকে পেশাদার শিল্পী হওয়ার স্বপ্নে, আবার কেউ কেউ মানসিক সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাসের খোঁজে।

নারী, নাচ ও সমাজ

অর্থী আহমেদের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নারীর শরীর ও নাচকে ঘিরে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করা। তিনি বারবার বলেছেন,
“নারীর নাচকে হালকা করে দেখা হয়, অথচ এটি একধরনের শাস্ত্র, সাধনা ও শক্তির প্রকাশ।”

তাঁর একাডেমিতে অনেক নারী আছেন, যাঁরা সংসার, বয়স বা সামাজিক চাপের কারণে নাচ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। অর্থীর কাছে নাচ তাঁদের কাছে ফিরে পাওয়ার একটি ভাষা।

একুশে পদক: ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত স্বীকৃতি

চলতি বছর একুশে পদক পাওয়ার পর অর্থী আহমেদ বলেন,
“এই সম্মান শুধু আমার নয়, যারা নাচকে জীবনের অংশ বানিয়েছেন, সেই সব নারী ও শিক্ষার্থীর।”

নৃত্যশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, এই স্বীকৃতি মূলত শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার পাশাপাশি নাচকে সামাজিক ও মানসিক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বীকৃতি।

সামনে পথ

অর্থীর পরিকল্পনা—নাচের সঙ্গে থেরাপি, গবেষণা ও প্রান্তিক নারীদের যুক্ত করা। ভবিষ্যতে তিনি নাচভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক কর্মশালা চালু করতে চান।

যে যাত্রা শুরু হয়েছিল শিশুকালে, আর যাকে একসময় অবহেলা করা হয়েছিল—সেই নৃত্যই আজ অর্থী আহমেদের পরিচয়, শক্তি ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির নাম।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0