আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে স্নেইল ফিভার, এশিয়ায় বাড়ছে সতর্কতা

যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী দেশে দেশে ছড়াতে পারে

Feb 3, 2026 - 17:35
Feb 3, 2026 - 17:37
 0  1
আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে স্নেইল ফিভার, এশিয়ায় বাড়ছে সতর্কতা
নতুন 'হাইব্রিড' এই পরজীবী বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ চিকিৎসকেরা এখনো নিশ্চিত নন- এই পরজীবী বহনকারী রোগীদের কীভাবে চিকিৎসা দিতে হবে

নীরব ঘাতক ‘স্নেইল ফিভার’: বদলে যাচ্ছে পরজীবী, বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকি

মানুষের চোখের আড়ালে, নিঃশব্দে শরীরে ঢুকে বছরের পর বছর লুকিয়ে থাকতে পারে এমন একটি পরজীবী এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করা এই পরজীবী রক্তনালিতে বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি ডেকে আনে। এই সংক্রমণই পরিচিত স্নেইল ফিভার বা বৈজ্ঞানিকভাবে স্কিস্টোসোমিয়াসিস নামে।

বিশেষ ধরনের মিঠাপানির শামুক এই পরজীবীর বাহক হওয়ায় রোগটির এমন নামকরণ। শামুক থাকা পানিতে এই পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ যখন সেই পানিতে নামে—গোসল, কৃষিকাজ বা দৈনন্দিন প্রয়োজনে—তখন লার্ভাগুলো ত্বক গলিয়ে শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

মানবদেহে প্রবেশের পর এই লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে। কিছু ডিম শরীর থেকে মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে এলেও অনেক ডিম লিভার, ফুসফুস, অন্ত্র কিংবা যৌনাঙ্গের টিস্যুতে আটকে যায়।

এই আটকে থাকা ডিম ধ্বংস করতে গিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আশপাশের সুস্থ কোষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে লিভার বিকল, ফুসফুসের জটিলতা, তলপেটের ব্যথা, রক্তক্ষরণ এমনকি ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগও দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ বছরের পর বছর ধরা না পড়ায় রোগী বুঝতেই পারেন না, শরীরের ভেতরে কী ভয়ংকর ক্ষতি হচ্ছে।

এই রোগের একটি গুরুতর রূপ হলো ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস, যেখানে পরজীবীর ডিম যৌনাঙ্গ ও মূত্রনালির আশপাশে আটকে যায়। এতে বন্ধ্যত্ব, যৌনাঙ্গে ক্ষত, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব আরও ভয়াবহ। সন্তান ধারণে অক্ষম হলে অনেক সমাজেই নারীকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, যা এই রোগকে শুধু চিকিৎসাগত নয়, সামাজিক সংকটেও পরিণত করে।

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এই রোগের চিকিৎসা নেন। আক্রান্তদের বড় অংশ আফ্রিকায় হলেও এখন পর্যন্ত ৭৮টি দেশে এই রোগের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

এশিয়ায় এই রোগের প্রভাব তুলনামূলক কম আলোচিত হলেও বাস্তবতা উদ্বেগজনক। চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে স্নেইল ফিভারের সংক্রমণ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও নদীভিত্তিক জীবনযাত্রার কারণে ঝুঁকি বেশি।

চীনে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ফলে সংক্রমণ অনেক কমেছে, তবে পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখনও লাখো মানুষ নিয়মিত সংক্রমণের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও শামুকের আবাসস্থল বাড়তে থাকায় এশিয়ায় ভবিষ্যতে এই রোগ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মানুষ ও প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবীগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র ধরন তৈরি করছে। এই নতুন পরজীবীগুলো মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই সংক্রমিত করতে পারে এবং আগের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও অভিযোজনক্ষম।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো সফলভাবে বংশবিস্তার করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না। ফলে ভুল রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ছে।

বর্তমানে স্নেইল ফিভার সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—বিশেষ করে শিশু, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের—নিয়মিত এই ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ফলে গত দুই দশকে বৈশ্বিকভাবে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

তবে নতুন হাইব্রিড পরজীবী প্রচলিত চিকিৎসায় কতটা সাড়া দেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে এই রোগ নিয়ে গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়ন কমে যাওয়ায় আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, স্নেইল ফিভার আর কেবল দরিদ্র অঞ্চলের সীমিত সমস্যা নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকিতে রূপ নিচ্ছে। সময়মতো নজর না দিলে ভবিষ্যতে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই পরজীবীকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই—কারণ এটি নীরবে বদলাচ্ছে, শক্তিশালী হচ্ছে এবং মানুষের অজান্তেই ছড়িয়ে পড়ছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0