প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কর ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জোর দাবি

উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা, সংস্কারের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে

Apr 5, 2026 - 19:30
 0  2
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কর ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জোর দাবি
সংগৃহীত ছবি ; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহারের কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে চাপ বাড়ছে—এমন উদ্বেগ তুলে ধরেছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ম্যান-মেইড ফাইবার থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টরসহ সম্ভাবনাময় প্রায় সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দেশের শীর্ষ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন। বৈঠকে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও নীতিগত সংস্কার নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

বৈঠকের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি। তিনি উন্নত দেশগুলোর আইন, নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সফল উদাহরণ বিশ্লেষণ করে সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, “শুধু অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা নয়, বৈশ্বিক বাস্তবতাও মাথায় রেখে আমাদের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।” ব্যবসায়ীরা বৈঠকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

তারা প্রস্তাব করেন—

  • ব্যাংকিং খাতকে আরও উন্মুক্ত করা
  • বিদেশি ঋণ গ্রহণ সহজ করা
  • স্থানীয় বন্ড বাজার শক্তিশালী করা

এর মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান তারা। বৈঠকে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিং চালু হলে লেনদেন সহজ হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া ব্যাংকিং ও বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও প্রধানত তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে নতুন খাতের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান ব্যবসায়ীরা।

তারা সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন—

  • আউটডোর সরঞ্জাম
  • বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প
  • সেমিকন্ডাক্টর শিল্প

বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ভবিষ্যতের “গেম চেঞ্জার” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশ এখন এক ধরনের “গ্লোবাল বিউটি কনটেস্ট”-এ অংশ নিচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াভারত-এর সঙ্গে তুলনা করে ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করার সুপারিশ করা হয়।

তারা বলেন, শুধু সস্তা শ্রম নয়—সহজ লাইসেন্সিং, নীতির স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার খরচ কমানোই এখন বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল চাবিকাঠি।

লজিস্টিক খাতে উচ্চ ব্যয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে জিডিপির ১৫-২০ শতাংশ এই খাতে ব্যয় হচ্ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।

তারা সুপারিশ করেন—

  • চট্টগ্রাম বন্দর-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি
  • বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন
  • বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

বর্তমান করব্যবস্থাকে জটিল ও অদক্ষ আখ্যা দিয়ে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানান। তারা বলেন—

  • বাণিজ্যনির্ভর কর কমিয়ে অভ্যন্তরীণ করব্যবস্থা জোরদার করতে হবে
  • অগ্রিম আয়কর বাতিল করতে হবে
  • উৎসে কর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

এছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার বাইরে নতুন সুবিধা চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীরা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল প্রণয়নের ওপর জোর দেন। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, যেমনটি দক্ষিণ কোরিয়াতাইওয়ান-এর শিল্পোন্নয়নে দেখা গেছে।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ব্যবসায়ীদের সব প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে নোট নেওয়া হয়েছে। কিছু সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে, বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দ্রুত নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।

সব মিলিয়ে, এই বৈঠক শুধু সমস্যার তালিকা নয়, বরং সমাধানের পথ খোঁজার একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0