বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত কত, চলবে কয়দিন?
অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারে যেমন পড়েছে, তেমনি এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মজুত, সরবরাহ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ। সরকার একাধিকবার জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানালেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি এবং অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো বড় ধরনের সংকট না থাকলেও ‘প্যানিক বাইং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে তুলছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। যদিও কিছু পরিমাণ অকটেন ও পেট্রোল দেশে উৎপাদিত হয়, তবুও সামগ্রিক চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ৯০ দিনের মজুত থাকা উচিত। ফলে বৈশ্বিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, মার্চের শেষ নাগাদ দেশে ডিজেলের মজুত ছিল প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ব্যবহারের হিসাবে এই মজুত প্রায় ১০-১২ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই হিসাব স্থির নয়। কারণ নিয়মিতভাবে বিদেশ থেকে নতুন চালান দেশে আসছে, যা মজুত পুনরায় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে বড় পরিমাণ ডিজেল আমদানি করা হয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে সহায়তা করছে।
এদিকে মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক গ্রাহক পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। এতে গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডার ঘটনাও বাড়ছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে গিয়ে তারাও চাপে আছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি রাতের বেলায় তেল বিক্রি সীমিত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। একদিনেই শতাধিক অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়ে সরবরাহ ও বিক্রয় তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে সরকার বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তির আওতায় তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন উৎস খোঁজার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে শুধু আমদানিনির্ভরতা কমানোই নয়, বরং বিকল্প জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি, যাতে অপ্রয়োজনীয় মজুত ও আতঙ্কজনিত আচরণ কমে আসে।
সব মিলিয়ে সরকার আশ্বস্ত করলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেই আশ্বাসের ফারাকই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই অস্থিরতা কাটিয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0