বিদেশি ঋণ গ্রহণ-পরিশোধ প্রায় সমান: অর্থনীতিতে চাপের ইঙ্গিত

বিদেশি ঋণ গ্রহণ-পরিশোধ প্রায় সমান: অর্থনীতিতে চাপের ইঙ্গিত

Mar 30, 2026 - 21:16
 0  4
বিদেশি ঋণ গ্রহণ-পরিশোধ প্রায় সমান: অর্থনীতিতে চাপের ইঙ্গিত
প্রতীকী ছবি

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ আসা এবং পরিশোধের পরিমাণ প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা ঋণচাপের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে মোট ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ২৭৯ কোটি ডলার ঋণ এবং ২৬ কোটি ডলার অনুদান। অন্যদিকে একই সময়ে সরকারকে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এর মধ্যে আসল ছিল প্রায় ১৯৫ কোটি ডলার এবং সুদ পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি ডলার।

অর্থাৎ, নতুন করে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ আসছে, তার প্রায় পুরোটাই পুরোনো ঋণ শোধে চলে যাচ্ছে—যা অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশকে চার বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া ঋণের পরিশোধ সময়সীমা এখন শুরু হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া, যার পরিমাণ প্রায় ৭৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার।

এরপর রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যারা দিয়েছে ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৫৬ কোটি ৬১ লাখ ডলার।

এছাড়া চীনভারত যথাক্রমে ২৫ কোটি ডলার এবং ২৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলার ঋণ ছাড় করেছে। জাপান থেকেও এসেছে প্রায় ১৯ কোটি ডলার।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশ মোট ২৪৩ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২৩৫ কোটি ডলার।

এতে বোঝা যায়, বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ পুরোপুরি কমেনি, তবে তা ব্যবহারের বড় অংশই এখন ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।

সম্প্রতি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণ কমিয়ে আনা হবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তিতে দাঁড় করানো।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের এই সমতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এতে উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

তারা পরামর্শ দিচ্ছেন—

  • উচ্চ সুদের ঋণ কমিয়ে স্বল্পসুদী ঋণে ঝোঁক বাড়ানো
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি
  • রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় বাড়ানো
  • রাজস্ব আদায় জোরদার করা

বিদেশি ঋণ এখন আর শুধু উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, বরং একটি বড় দায় হিসেবেও সামনে আসছে। ঋণ ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা ও সতর্কতা না থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই সরকারের জন্য যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি সময়োপযোগী নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে এটিকে সুযোগে পরিণত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0