অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর: অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে?
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর: স্থিতিশীলতা এলেও অর্থনীতিতে গতি ফিরল কতটা?
গাজী আরমানঃ- জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নেয়, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল প্রবল চাপের মুখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দাম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ, ব্যাংকখাতের অস্থিরতা এবং বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ফলে দেড় বছর পর এসে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই সরকার অর্থনীতিকে কতটা সামাল দিতে পেরেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতির সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া ঠেকানো। সেই দিক থেকে তারা একটি স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বড় ধরনের ধস নামেনি, আর সেটিকেই অনেকেই এই সরকারের প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তবে স্থিতিশীলতা এলেও অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সরকার ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। নতুন টাকা ছাপানো বন্ধ করা হয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো হয়। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আলু, পেঁয়াজ, তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা রয়ে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্যের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের ধারায় থাকা দেশটি আবার উল্টো পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মানুষের আয় বাড়েনি, বরং ব্যয় বেড়েছে—এই বৈষম্য দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায়। এক সময় বিপজ্জনকভাবে নেমে যাওয়া রিজার্ভ ধীরে ধীরে বেড়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকখাতে আস্থার সংকট কিছুটা কাটিয়ে ওঠার ফলেই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে, যা সরকারের একটি ইতিবাচক অর্জন।
ব্যাংকখাত দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে জর্জরিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে এবং কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয়। এতে ব্যাংকখাতে একটি শৃঙ্খলার সূচনা হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড মাত্রায় বেড়েছে।
খেলাপি ঋণের বড় অংশই আগের সময়ে দেওয়া ঋণ, যার অনেক গ্রহীতা এখন পলাতক বা অচিহ্নিত। ফলে ঋণ আদায় কার্যত স্থবির। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দেশি বিনিয়োগকারীরা যেমন পিছিয়ে গেছেন, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ হয়নি। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বরং বেকারত্ব বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারাই এই সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
পূর্ববর্তী সময়ে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ সামনে এনে সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। দেশে ও বিদেশে কিছু সম্পদ জব্দ করা হলেও পাচার হওয়া অর্থের তুলনায় এই অগ্রগতি খুবই সীমিত।গত দেড় বছরে দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করেছে সরকার। আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া—স্বল্প সময়ে বড় সাফল্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়াটাই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
আগের সময়ে নেওয়া বিপুল বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ কিছুটা বাড়ায় আপাতত এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে সামনে বড় প্রকল্পগুলোর ঋণের ছাড়ের সময় শেষ হলে পরবর্তী সরকারের জন্য চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে ধসের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরাতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তবে ব্যাংকখাত সংস্কার, রিজার্ভ স্থিতিশীলতা এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরুর মতো কিছু পদক্ষেপ ভবিষ্যতের জন্য আশার জায়গা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী সরকার অর্থনীতিকে কতটা সামনে এগিয়ে নিতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0