বর্ষবরণ ঘিরে চারুকলায় সৃষ্টির উৎসব
প্রস্তুত হচ্ছে বৈশাখী শোভাযাত্রার নান্দনিক মোটিফ
গাজী আরমানঃ- আর মাত্র কয়েকদিন পরেই বাংলা নববর্ষ। এ উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়লেও তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। প্রতি বছরের মতো এবারও বৈশাখী শোভাযাত্রাকে ঘিরে চারুকলা প্রাঙ্গণে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুরো এলাকা যেন রঙ, কল্পনা আর সৃজনশীলতার এক অনন্য কর্মশালায় পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, চারুকলার প্রতিটি কোণজুড়ে চলছে ব্যস্ততা। কেউ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ রঙের তুলিতে প্রাণ দিচ্ছেন বিশাল আকৃতির মোটিফে। কোথাও চলছে মুখোশ তৈরির কাজ, আবার কোথাও সরা রাঙানোর আয়োজন। সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশে বিরাজ করছে উৎসবমুখর প্রাণচাঞ্চল্য।
এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রায় স্থান পাচ্ছে পাঁচটি প্রধান মোটিফ। এর মধ্যে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে মোরগ, হাতি এবং শান্তির প্রতীক সুখের পায়রা। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী টেপা পুতুলের আদলে তৈরি করা হচ্ছে আরেকটি মোটিফ। সাম্প্রতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে প্রতীকীভাবে যুক্ত করা হয়েছে ‘একতারা’—যা শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং বাঙালির লোকসংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত।
শোভাযাত্রার সার্বিক দায়িত্ব পালন করছে চারুকলা অনুষদের ৭১তম ব্যাচ। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নয়, অংশ নিচ্ছেন অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থীরাও। তাদের অভিজ্ঞতা ও নতুনদের উদ্যমের মিশেলে প্রতিটি মোটিফ হয়ে উঠছে আরও পরিপূর্ণ ও অর্থবহ।
শিক্ষার্থীরা জানান, এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’—এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই মোটিফগুলোর নকশা ও রঙের বিন্যাস করা হচ্ছে। প্রতিটি শিল্পকর্মে তুলে ধরা হচ্ছে ঐক্য, প্রতিবাদ, মানবতা ও নতুন সূচনার বার্তা। রঙের ব্যবহারেও রাখা হচ্ছে বৈচিত্র্য—উজ্জ্বল লাল, হলুদ, নীলসহ নানা বর্ণের সমন্বয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব।
চারুকলার শিক্ষকদের মতে, বৈশাখী শোভাযাত্রা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি বাঙালির চেতনা, ঐতিহ্য ও প্রতিবাদের ভাষা। ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই শোভাযাত্রা এখন আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এদিকে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। শোভাযাত্রার দিন চারুকলা এলাকা ও আশপাশে বাড়ানো হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে নির্দিষ্ট প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ।
সব প্রস্তুতি শেষ করে আগামী পহেলা বৈশাখের সকালে চারুকলা প্রাঙ্গণ থেকে বের হবে বর্ণিল এই শোভাযাত্রা। ঢাকাবাসীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ এতে অংশ নেবেন। রঙ, সুর, প্রতিবাদ আর আনন্দের মিশেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত এখন চারুকলা—যেখানে শিল্পই হয়ে উঠছে উৎসবের প্রধান ভাষা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0