মৌসুমের শুরুতেই বাজারে সাতক্ষীরার আম
ফলন ভালো ও রপ্তানির আশা
জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হওয়ার আগেই দেশের বাজারে আসতে শুরু করেছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার আগাম জাতের আম। মৌসুমের একেবারে শুরুতেই এই জেলার গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম পাইকারি বাজারে উঠেছে, আর এতে চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর জেলায় আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে ঝড়ের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে। কিছু বাগানে পোকার আক্রমণ দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে ফলন ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন জাতের আম মণপ্রতি প্রায় উনিশশ থেকে চব্বিশশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একসময় সুন্দরবন ও চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত সাতক্ষীরা এখন ধীরে ধীরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে আগাম মৌসুমে বাজারে আম সরবরাহের কারণে জেলার কৃষকরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী আম উৎপাদনকারী জেলার পাশাপাশি এখন সাতক্ষীরাও দেশের আম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪ হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এতে যুক্ত রয়েছেন কয়েক হাজার চাষি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন। একই সঙ্গে বিদেশে অন্তত ১০০ টন আম রপ্তানির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী ইতোমধ্যে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি জাতের আম বাজারে আসবে। অন্যদিকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আম সংগ্রহ শুরু হতে এখনও কয়েকদিন বাকি রয়েছে।
কৃষি গবেষকদের মতে, সাতক্ষীরার ভৌগলিক অবস্থানই এই জেলার আম আগে পাকতে বড় ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় এলাকায় তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকায় আমের মুকুল দ্রুত পরিপক্ব হয়। এছাড়া সমুদ্রঘেঁষা অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার উপস্থিতিও ফল দ্রুত পাকতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্ষাংশভেদে আম সংগ্রহের সময় পরিবর্তিত হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে আম পাকতে কিছুটা বেশি সময় লাগে। ফলে সাতক্ষীরার একই জাতের আম রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আগে বাজারে চলে আসে।
তবে আগাম বাজারে এলেও স্বাদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য হয় না বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। তাদের মতে, মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়ার কারণে মিষ্টতার মাত্রায় সামান্য তারতম্য হতে পারে। উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত মাটিতে উৎপাদিত আমে শুকনো উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকায় অনেক সময় স্বাদ আরও গাঢ় হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ আম উৎপাদনে জোর দিচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। বিশেষ করে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কীটনাশকের ব্যবহার কমেছে। এতে সাতক্ষীরার আম ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারেও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিতে নানা ঝুঁকি তৈরি হলেও আম চাষ তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক এখন এই খাতে ঝুঁকছেন। ফলে প্রতিবছর জেলায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাতক্ষীরার আমের সরবরাহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারেও এবার ইতিবাচক সাড়া মিলতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0