বিদ্যুতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, দেউলিয়া পরিস্থিতি ; বিদ্যুৎ মন্ত্রী
গ্রীষ্মে ১৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার শঙ্কা
গাজী আরমানঃ- দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের বকেয়া নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে দেশের নতুন সরকার। সামনে রমজান-পরবর্তী সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল—এই সময়ে চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বর্তমানে চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে; গরমে তা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে যেতে পারে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, গত সাত-আট মাস ধরে নিয়মিত বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানি ও উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পিডিবি সূত্রে জানা যায়, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। আমদানি সক্ষমতাসহ মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। তবে জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে সব কেন্দ্র একসঙ্গে চালু রাখা যায় না। ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই দেশে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়।
বাংলাদেশে মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশই গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে; তেল ও কয়লাও প্রায় সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আমদানি ব্যয় সরাসরি ডলারের রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, “গরমে চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সব জ্বালানি আমদানি করতে গেলে বিপুল ডলার প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জ।” তাঁর হিসেব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বছরে ২০–২৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ব্যয় হতে পারে, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর।
দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা মোট উৎপাদনের প্রায় ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। এসব কেন্দ্র চালাতে উচ্চমূল্যের জ্বালানি প্রয়োজন হওয়ায় ভর্তুকির চাপ বাড়ে। গত বছর বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে।
বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন জানিয়েছে, এলসি খোলায় জটিলতা ও বকেয়া বাড়ার কারণে তেলের মজুদ কমছে। জানুয়ারিতে যেখানে মজুদ এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি ছিল, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা নেমে এসেছে প্রায় ৮০ হাজার টনে। দ্রুত অর্থ পরিশোধ না হলে গ্রীষ্মে উৎপাদন বিঘ্নিত হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র সমন্বয় করে চালাতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, আর্থিক সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষায়, “বিদ্যুৎ খাত আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় গেছে। বকেয়া, জ্বালানি আমদানি—সব মিলিয়ে জটিল পরিস্থিতি। আপাতত ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।” তিনি জানান, রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আমদানি বাড়িয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর প্ল্যান্ট ইউজ ফ্যাক্টর বাড়ানো, তেলভিত্তিক উৎপাদন সীমিত করা, বিদ্যুতের দাম সমন্বয় এবং ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও বিতরণ ব্যবস্থার অপচয় কমানোও জরুরি।
সামনে গ্রীষ্ম—চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। নতুন সরকারের জন্য বিদ্যুৎ খাত তাই এখন শুধু সেবা নয়, বড় আর্থিক ও নীতিগত পরীক্ষার মঞ্চ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0