ইউনূস সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো বিতর্ক কেন?

ট্রাম্পের চিঠি

Feb 21, 2026 - 13:59
 0  3
ইউনূস সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো বিতর্ক কেন?
বিদায় নেওয়ার আগে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চু্ক্তি করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, নতুন সরকার এখনোই চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করেনি

গাজী আরমান - বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিঠিতে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকারের সময়ে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল হবে এবং এতে উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে চুক্তিটি সই হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববাহী একটি চুক্তি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হলো না কেন?

পাল্টা শুল্ক থেকে চুক্তি: নয় মাসের দরকষাকষি

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার নির্ধারণ করা হয় ৩৫ শতাংশ, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ চুক্তির পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশে।

গত নয় মাসে একাধিক দফায় বৈঠক ও দরকষাকষির পর ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশই বেশ কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত বা ধাপে ধাপে শুল্কছাড় সুবিধা পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি এবং বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্য এই সুবিধার আওতায় এসেছে।

বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে আনুমানিক ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, বিপরীতে আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাণিজ্য ভারসাম্যে বাংলাদেশ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার উদ্বৃত্তে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল—বাংলাদেশকে আমদানি বাড়িয়ে এই ঘাটতি কমাতে হবে।

‘কমার্শিয়াল কনসিডারেশন’ নিয়ে প্রশ্ন

চুক্তির ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘কমার্শিয়াল কনসিডারেশন’ শিরোনামে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আমদানির নির্দিষ্ট অঙ্গীকার উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে—

  • যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা হবে

  • আগামী ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি

  • বছরে প্রায় সাড়ে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এসব ক্রয় বাস্তব চাহিদা বিবেচনায়, নাকি কেবল বাণিজ্য ভারসাম্য সমন্বয়ের জন্য? উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর আর্থিক সক্ষমতা ও বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করে দীর্ঘমেয়াদি আমদানির প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতে নীতি পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করতে পারে। প্রয়োজনে ক্রয় পেছাতে গেলে আবার উচ্চ শুল্ক আরোপের চাপ আসতে পারে।

তৈরি পোশাক খাতের স্বস্তি, কিন্তু কতটা লাভ?

চুক্তির একটি বড় দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা। এতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। ফলে শুল্ক সুবিধা পেলেও নেট মুনাফা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে কাঁচামালের দামের ওপর।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে তার ভাষণে বলেন, শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং পোশাকে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। তবে সমালোচকদের মতে, বিনিময়ে যে শর্তগুলো মানতে হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভূরাজনৈতিক প্রভাবের শঙ্কা

চুক্তিতে উল্লেখ আছে—বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দেশগুলো থেকে নির্দিষ্ট কেনাকাটা সীমিত করবে। যদিও দেশগুলোর নাম উল্লেখ নেই, তবু বিশ্লেষকদের ধারণা, এতে চীনরাশিয়া-এর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় প্রভাব পড়তে পারে।

পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত ধারাতেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও চলমান প্রকল্প—বিশেষ করে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—চুক্তির আওতার বাইরে থাকবে বলে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

রাজস্ব ও নীতিনির্ধারণে সম্ভাব্য চাপ

চুক্তির ফলে বহু পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব, কারিগরি মান ও ই-কমার্স সংক্রান্ত ধারায় মার্কিন মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকায় ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে পারে বলে মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে তৃতীয় দেশের পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার শর্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উচ্চমূল্যের মুখে পড়তে পারেন।

নতুন সরকারের সামনে কী পথ?

চুক্তি ইতোমধ্যে কার্যকর। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নবনির্বাচিত সরকারের উচিত এর ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। যদিও কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চুক্তি থেকে সরে আসা সহজ হবে না।

এখন নজর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দিকে—তারা কি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে এগোবে, নাকি পুনর্মূল্যায়নের পথে হাঁটবে? বাণিজ্য, কূটনীতি ও ভূরাজনীতির সমন্বয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0