এআই প্রযুক্তিতে জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া ভিডিও, ফের উত্তাল সামাজিক মাধ্যম
সামাজিক মাধ্যমে জাইমা রহমানকে ঘিরে বিতর্কিত ভিডিও
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। ভিডিওটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে লক্ষ্য করে ছড়ানো হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এতে একজন তরুণীকে বন্ধুদের সঙ্গে নাচ-গান ও আড্ডায় অংশ নিতে দেখা যায়। ভিডিওটি লন্ডনে ধারণ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এর সত্যতা বা প্রেক্ষাপট এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
ভিডিওটি একাধিক ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পোস্টগুলোর মন্তব্যে জাইমা রহমানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেখা যায়। এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তার নামে ভুয়া ভিডিও তৈরির অভিযোগও উঠেছিল।
সমালোচকরা বলছেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে একজন তরুণীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও ‘চরিত্র’কে অস্ত্র বানানো
নারী অধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বাংলাদেশের মতো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জনপরিসরে দৃশ্যমান বা প্রভাবশালী হয়ে ওঠা নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানো নতুন নয়। বিশেষ করে পোশাক, ব্যক্তিগত জীবনধারা বা সামাজিক উপস্থিতিকে ‘চরিত্র’ প্রশ্নের মাধ্যমে আক্রমণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সিনিয়র ফেলো মাহিন সুলতান সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কীভাবে সময় কাটাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে কোথায় যাবেন বা কী করবেন—তা তার ব্যক্তিগত বিষয়। এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লঙ্ঘন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ-এর সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী কাউকে দুর্বল করতে তার পরিবারের নারী সদস্যদের অপমান করা একধরনের পুরোনো কৌশল।
আগেও ঘটেছে এমন প্রচারণা
এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালে মুহাম্মদ ইউনূস-এর মেয়ে মনিকা ইউনূস কিংবা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর নাতনী আমরিন খন্দকার সেমন্তীকেও সামাজিক মাধ্যমে কটূক্তি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। যদিও তারা সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত নন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন—নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণের নজির রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নারী প্রার্থীকে পরাজিত করতে রাজনৈতিক মতাদর্শের বদলে ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে আনা হয় বেশি।
‘বট’ ও ভুয়া অ্যাকাউন্টের ব্যবহার
ডিজিটাল পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এমন প্রচারণায় প্রায়ই ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা স্বয়ংক্রিয় ‘বট’ ব্যবহার করা হয়, যাতে অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বয়ান ভাইরাল করা যায়। এতে করে একটি ভিডিও বা ছবি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়।
ডিজিটাল নীতিমালা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, আইন প্রয়োগ জরুরি হলেও তা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
নারী অংশগ্রহণ বনাম অনলাইন হেনস্তা
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আন্দোলন-সংগ্রামে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেলেও অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন বণ্টনে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে নারীর হার ছিল খুবই কম, ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রার্থী দেয়নি।
এই বৈপরীত্য সমাজে বিদ্যমান নারীবিদ্বেষী মনোভাবের প্রতিফলন বলে মনে করছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, মাঠের রাজনীতি ও অনলাইন আক্রমণ—দুটিই একই সামাজিক কাঠামোর অংশ।
সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং দল-মত নির্বিশেষে নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নেওয়া।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের ভাষায়, “নারী আমার পক্ষের না বিপক্ষের—তা বিবেচ্য নয়। লিঙ্গের কারণে যে কোনো নারীর ওপর আক্রমণ হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই নাগরিক দায়িত্ব।”
অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক মাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মঞ্চ বানানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও সম্মানজনক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0