কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে আবারও জেলেদের অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে তিনটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। শনিবার সকালে শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে পুরো জেলেপল্লীতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভোরে সাগরে মাছ শিকার শেষে জেলেরা নিজ নিজ ট্রলার নিয়ে টেকনাফে ফিরছিলেন। এ সময় নাফ নদীর মোহনায় মিয়ানমার অংশের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান নেওয়া আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের গতিরোধ করে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে জেলেদের পরিবারগুলো উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।
আটক হওয়া জেলেরা সবাই টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন বয়সী মাঝি ও জেলে, যাদের কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর বয়সী একজনও রয়েছে, যা ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ট্রলারগুলোর মালিকরাও একই এলাকার বাসিন্দা। তারা জানিয়েছেন, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাদের জীবিকা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে যেতে হলেও সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তার ঘাটতি তাদেরকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, তিনটি নৌকার ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জেলেদের পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। সীমান্তে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেলেদের দ্রুত ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলেদের দাবি, গত দুই বছরে অন্তত পাঁচ শতাধিক জেলেকে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে গেছে। যদিও এর মধ্যে অনেককে পরবর্তীতে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে, তবুও এই পুনরাবৃত্তি তাদের জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নাফ নদীর সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত এলাকায় পড়ায় জেলেদের নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সীমারেখা ঘেঁষে মাছ শিকার করতে যাওয়া বাংলাদেশি জেলেরা প্রায়ই অপহরণ, চাঁদাবাজি বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, বিকল্প নিরাপদ মাছ ধরার অঞ্চল নির্ধারণ এবং দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান না হলে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো জেলের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।