ভোট না দিলে “আক্রান্ত” হওয়ার ভয়: আওয়ামী লীগের তৃণমূলের দুশ্চিন্তা
ভোট বর্জন প্রচারণা চালালেও সাধারণ সমর্থকরা বিভ্রান্ত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তৃণমূল স্তরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরা ভোট না দিলে “আক্রান্ত” হওয়ার ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার কথাও ভাবছেন বলে দেখা গেছে।
অপরদিকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের এক প্রাসঙ্গিক ঘটনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর তার বাড়িতে সমবেদনা জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ পর জামায়াতের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনও ওই বাড়িতে যান। এ ঘটনা প্রমাণ করছে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও উপলব্ধি করছেন।
আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নেবে না—এ কথা দলীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে “নো বোট, নো ভোট” (নৌকা নেই, ভোটও নেই) স্লোগান ছড়াচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে দলের সমর্থকদের মনোভাব একরকম নয়। অনেকেই বলছেন, ভোট দিতে যাবেন—কারণ ভোট না দিলে ভোটের হার কমে যাবে এবং নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া কঠিন হবে।
একজন স্থানীয় নেতা জানান, ভোট না দেয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হলো “নেত্রীর নির্দেশ” এবং ভোটের মাধ্যমে তাদের বিপদ ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা। তিনি বলেন, “ভোট দিতে গেলে আমাদের চিহ্নিত করা হবে। বাঁচতে হলে ভোট না দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
কিছু ভোটার তাদের নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকা বজায় রাখার জন্য ভোটে অংশ নেবেন বলে মনে করছেন। এক সমর্থক জানান, তারা “আওয়ামী পরিবার” হিসেবে পরিচিত, তাই ভোট না দিলে তাদের ওপর নির্যাতন বা হেনস্থা হতে পারে—এ ভয় থেকেই তারা ভোট দিতে যেতে বাধ্য বোধ করছেন।
এদিকে দলীয় কমিটি না থাকলেও অনেক সমর্থক এখন অন্য কোনো দলের সঙ্গে জড়িত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফিরে আসবে কি না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনে টিকে থাকার জন্য কিছু সমর্থক ভোট দিতে গিয়ে অন্য দলের দিকে ঝুঁকছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
১) ভোটার উপস্থিতি: আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গেলে ভোটের হার বাড়বে, না গেলে কমবে।
২) ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব: যদি তারা কোনো নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
৩) ভোটবিহীন ভোটে বৈধতা: আওয়ামী লীগ ছাড়াই ভোটের হার যদি বেশি হয়, তাহলে সেটি দলটির জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থন নির্ধারণ করতে হলে দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হতো। তিনি বলেন, “আমি যদি তাদের ভোট ৩০ শতাংশ ধরি, তাহলে এত ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।”
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদ বলেন, “আওয়ামী লীগের ভোটাররা কী করেন তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। যদি তাদের বড় অংশ ভোট না দেয়, তবে ফলাফল একদম আলাদা হতে পারে।” তিনি বলেন, ভোট বর্জন হলে “বৈধতার সংকট” তৈরি হবে—যা শুধু আইনি নয়, নৈতিক প্রশ্নও হয়ে দাঁড়াবে।
আওয়ামী লীগের ভোটের হার ২০২৬ সালের নির্বাচনে কত হবে—এ প্রশ্নে বিভিন্ন মত রয়েছে। ইতিহাস বলছে, দলটির ভোট সর্বোচ্চ ছিল ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ। তবে ১৯৭৯ সালে এটি কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়ায়। পরের কয়েকটি নির্বাচনে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে ভোট হার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভোট ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে ভোটাররা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন—ভোট বর্জন করবেন নাকি ভোট কেন্দ্রে যাবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ভোটের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তাহলে শুধু নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে না, একই সঙ্গে অভ্যুত্থানের প্রতি জনমতের সমর্থনও স্পষ্ট হবে। এতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।
ফলে এই নির্বাচন শুধু বিএনপি-জামায়াতের লড়াই নয়—এতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতও নির্ভর করছে। ভোট না দেওয়া, ভয়ভীতি, ভোট হার ও রাজনৈতিক সমর্থনের পরিবর্তন—এসব বিষয় একসাথে মিলিয়ে আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0