বিপিএলে বেটিং ও ফিক্সিং কেলেঙ্কারি: পাঁচজন সাময়িক নিষিদ্ধ
ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর অবস্থানে বোর্ড
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ঘিরে আবারও সামনে এলো বেটিং ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ। দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসরকে কেন্দ্র করে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগে পাঁচজনকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বোর্ডের দুর্নীতি দমন ইউনিট (ACU)।
বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেটিং, তথ্য গোপন, তদন্তে অসহযোগিতা এবং দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিপিএলের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছিল, এই ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও গভীর করল।
বিসিবির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির টিম ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি কো-ওনার মো. তৌহিদুল হক তৌহিদের বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বোর্ডের দাবি, দুর্নীতি দমন ইউনিটের চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা গোপন করেছেন এবং কিছু ডিজিটাল তথ্য ও যোগাযোগের রেকর্ড মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছে বিসিবি।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের সাময়িকভাবে সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৪ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “তদন্তে তথ্য গোপন করা কিংবা প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা দুর্নীতির মামলায় বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই বোর্ড এই ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।”
এদিকে দেশীয় ক্রিকেটার অমিত মজুমদার এবং টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ম্যাচ সংশ্লিষ্ট বাজিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছু ম্যাচকে কেন্দ্র করে সন্দেহজনক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তাদেরও সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে বিসিবি।
বোর্ডের দুর্নীতি দমন ইউনিট মনে করছে, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ বেটিং চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। এ কারণে আরও কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞাসহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দুর্নীতি বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে পৃথক এক সিদ্ধান্তে সামিনুর রহমানকে বিপিএল সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করেছে বিসিবি।
বোর্ড জানিয়েছে, তদন্তে তার বিরুদ্ধে একাধিক বিপিএল আসরে বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি আপত্তি জানাননি এবং বিসিবির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই স্বীকারোক্তি তদন্তকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় চক্রের নাম সামনে আসতে পারে।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিকবার ফিক্সিং ও বেটিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৩ সালে বিপিএলে স্পট ফিক্সিংয়ের ঘটনায় কয়েকজন দেশি-বিদেশি ক্রিকেটার ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনার পর বিপিএলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বিসিবি দুর্নীতি দমন কার্যক্রম জোরদার করলেও সময় সময় নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে।
ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে বিপুল অর্থের লেনদেন, অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে।
বিসিবি সভাপতি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “ক্রিকেটের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হবে।
বোর্ড ইতোমধ্যে সব ফ্র্যাঞ্চাইজি দলকে সতর্ক করেছে এবং খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তাদের জন্য নতুন করে দুর্নীতি বিরোধী নির্দেশনা জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিপিএল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। দেশি-বিদেশি তারকাদের অংশগ্রহণে প্রতি বছর এই আসর ঘিরে দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহ থাকে।
তবে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় হতাশ ক্রিকেটপ্রেমীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, শুধু সাময়িক নিষেধাজ্ঞা নয়, দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0