হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া উদ্যোক্তা জিমি লাইয়ের ২০ বছরের কারাদণ্ড
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ, জিমি লাইয়ের সাজা ঘিরে বিতর্ক
হংকংয়ের একটি আদালত দেশটির প্রখ্যাত গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। গত ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নিরাপত্তা আইনসংক্রান্ত মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করার পর এ সাজা ঘোষণা করা হয়। আদালতের রায়ে তার অপরাধকে ‘গুরুতর’ ও ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ৭৮ বছর বয়সী জিমি লাই এর আগে একটি ঔপনিবেশিক আইনের আওতায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগেও দণ্ডিত হয়েছিলেন। ২০২০ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। সাম্প্রতিক রায়ের সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় তাকে শান্তভাবে মাথা নেড়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়। এ সময় সাদা জ্যাকেট ও কালো সানগ্লাস পরা জিমি লাইয়ের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম অ্যাপল ডেইলি–র ছয়জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহীও আদালতে উপস্থিত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ রয়েছে।
আদালত জানায়, রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথি ৪৭ পৃষ্ঠার হলেও কেবল সাজাসংক্রান্ত অংশ পাঠ করা হয়েছে। ফলে প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই রায় ঘোষণার কার্যক্রম শেষ হয়। বিচারকদের মতে, বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে যে ষড়যন্ত্রের কথা উঠে এসেছে, তা ছিল সুপরিকল্পিত এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত মারাত্মক।
জিমি লাই বরাবরই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তবে আদালত তার শারীরিক অসুস্থতাকে সাজা লাঘবের জন্য যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করেনি। তার আইনজীবীরা জানান, তিনি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ একাধিক রোগে ভুগছেন। কিন্তু বিচারকদের মতে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা সাধারণত শাস্তি কমানোর ভিত্তি হতে পারে না।
মানবাধিকার সংগঠনের কড়া সমালোচনা
এই রায়ের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জিমি লাইয়ের কারাদণ্ডকে ‘কার্যত একটি মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে, এত দীর্ঘমেয়াদি সাজা একই সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অন্যায়। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন মন্তব্য করেন, বছরের পর বছর ধরে জিমি লাইয়ের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করা এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠরোধের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক বিবৃতিতে এই রায়কে হংকংয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ‘কফিনে শেষ পেরেক’ বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী জোডি গিনসবার্গ বলেন, হংকংয়ে আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ এবং কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তির আহ্বান জানান। সিপিজের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চীনে অন্তত ৫১ জন এবং হংকংয়ে আটজন সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন।
পরিবার ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জিমি লাইয়ের পরিবারের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তার ছেলে সেবাস্টিয়ান লাই অভিযোগ করেছেন, তার বাবার মুক্তির জন্য যুক্তরাজ্য সরকার যথেষ্ট কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়নি। এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন অল্প কয়েকদিন আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফর করেছেন।
যুক্তরাজ্যের জোরপূর্বক আটক ও জিম্মি বিষয়ক একটি পার্লামেন্টারি গ্রুপও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুর্বল কূটনীতির কারণে জিমি লাইয়ের মুক্তি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রভাব
চীনের ২০২০ সালে প্রণীত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় অভিযুক্ত সবচেয়ে পরিচিত ব্যক্তিদের একজন জিমি লাই। ২০১৯ সালে হংকংয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর এই আইন কার্যকর হয়। সমালোচকদের মতে, এই আইনের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের চুপ করানো হচ্ছে।
এর আগে একই আইনের আওতায় সাবেক আইনবিদ বেনি তাইকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একটি অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগে তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
জিমি লাই: এক জীবন, এক প্রতীক
চীনের গুয়াংজুতে জন্ম নেওয়া জিমি লাই ১২ বছর বয়সে হংকংয়ে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে তিনি পোশাক ব্র্যান্ড ‘জিওর্দানো’সহ একাধিক সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে নেক্সট ম্যাগাজিন ও অ্যাপল ডেইলি–র মতো গণতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের পর তিনি প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেন এবং হংকংয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠে পরিণত হন। তার সমর্থকদের কাছে তিনি স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের প্রতীক হলেও, বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
জিমি লাইয়ের এই সাজাকে কেন্দ্র করে হংকংয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0