মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে একটি অদ্ভুত দাবি—যুক্তরাষ্ট্র নাকি বিমান ব্যবহার করে ‘মেঘ চুরি’ করছে, আর যুদ্ধের কারণে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে বৃষ্টিপাত বেড়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় ইরাকের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল-খাইকানির এক মন্তব্যকে ঘিরে। এক সপ্তাহ আগে আল-রাশিদ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র নাকি আকাশে মেঘ ‘ভেঙে ফেলা’ এবং ‘চুরি’ করার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতে ব্যস্ত থাকায় এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, ফলে ইরাকে আবার বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশে নানা রূপে প্রচারিত হতে থাকে। তুরস্কে কেউ কেউ দাবি করছেন, যুদ্ধের কারণে আকাশপথ বন্ধ থাকায় ‘মেঘ চুরি’ বন্ধ হয়েছে, তাই সেখানে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, ইরানের দীর্ঘস্থায়ী খরা নাকি কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
এ ধরনের দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানীরা। ইরাকের আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখপাত্র আমের আল-জাবিরি বলেন, “এ ধরনের বক্তব্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, এটি যুক্তিসঙ্গতও নয়।” তিনি জানান, চলতি বছর ইরাকে বেশি বৃষ্টিপাত হবে—এমন পূর্বাভাস অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল, যা কোনো যুদ্ধ বা গোপন প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মেঘ চুরি’ নামে যে ধারণাটি ছড়ানো হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবের ‘ক্লাউড সিডিং’ প্রযুক্তিকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। ক্লাউড সিডিং একটি সীমিত পরিসরের আবহাওয়া পরিবর্তন পদ্ধতি, যেখানে বিদ্যমান মেঘের মধ্যে ক্ষুদ্র কণা ছড়িয়ে বৃষ্টিপাত সামান্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এটি কোনোভাবেই আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ বা একটি অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ‘মেঘ সরিয়ে নেওয়া’র মতো কাজ করতে পারে না।
আবুধাবির খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস বলেন, এই পদ্ধতি মূলত মেঘকে সামান্য উদ্দীপনা দেয়, কিন্তু পুরো আবহাওয়া ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এর নেই। একইভাবে অন্যান্য গবেষকরাও জানিয়েছেন, ক্লাউড সিডিং থাকলেও তার প্রভাব খুবই সীমিত এবং তা স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ওঠানামার মধ্যেই মিলিয়ে যায়।
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কাবে মাদানি মনে করেন, মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ঘাটতি এবং অবিশ্বাস থেকেই এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়। জটিল জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও আকস্মিক বন্যার মতো ঘটনাগুলোর সহজ ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে অনেকেই এমন অযৌক্তিক ধারণাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
বিজ্ঞানীরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত কারণ হলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা—এসবই মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার।
বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও তা যাচাই করা আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। ‘মেঘ চুরি’ নিয়ে ছড়ানো এমন গুজব শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, বরং বাস্তব জলবায়ু সংকট সম্পর্কে মানুষের মনোযোগও সরিয়ে দিচ্ছে।