আর্টেমিস-২ নভোচারীরা কেন চাঁদে পা রাখবেন না?

চাঁদে ফেরা এত কঠিন কেন? ৫০ বছর পরও প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বিশ্ব

Apr 5, 2026 - 18:24
 0  4
আর্টেমিস-২ নভোচারীরা কেন চাঁদে পা রাখবেন না?
সংগৃহীত ছবি

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতীকী বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলোর একটি হলো ১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষের প্রথম পদচারণা। নাসা পরিচালিত অ্যাপোলো ১১ মিশন-এ নীল আর্মস্ট্রং-এর সেই বিখ্যাত পদক্ষেপ আজও প্রযুক্তি ও মানব সাহসের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মানুষ এখনো নিয়মিতভাবে চাঁদে যাওয়া শুরু করতে পারেনি—বরং নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকু-র একটি বহুল আলোচিত মন্তব্য—“আজকের একটি স্মার্টফোনে ১৯৬৯ সালের নাসার পুরো দলের চেয়েও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা রয়েছে”—প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি সহজ উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই তুলে ধরা হয়।

তবে এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও সরলীকৃত। অ্যাপোলো যুগের কম্পিউটার, বিশেষ করে অ্যাপোলো গাইডেন্স কম্পিউটার, ছিল অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতার হলেও তা ছিল নির্ভরযোগ্য, রিয়েল-টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এবং মহাকাশের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী। অন্যদিকে আধুনিক স্মার্টফোনে প্রসেসিং ক্ষমতা বেশি হলেও সেগুলো মহাকাশ অভিযানের জন্য ডিজাইন করা নয়।

অর্থাৎ, “ক্ষমতা” শুধু প্রসেসরের গতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত নির্ভরযোগ্যতা, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও বিশেষায়িত নকশাও।

অ্যাপোলো কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদে গিয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন সরাসরি চাঁদের মাটিতে হেঁটেছেন। কিন্তু ১৯৭২ সালের পর থেকে আর কোনো মানবচন্দ্রাভিযান হয়নি।

এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

  • ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়া
  • রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তন
  • শীতল যুদ্ধের প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়া

১৯৬০-এর দশকে নাসার বাজেট ছিল মার্কিন ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১ শতাংশেরও কমে।

বর্তমানে নাসা নতুন করে চাঁদে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু চাঁদে যাওয়া নয়, বরং সেখানে স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযানকে সহজ করা।

সাম্প্রতিক আর্টেমিস-২ মিশন-এ চারজন নভোচারী—রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন—চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে আসবেন। তবে তারা চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেন না।

চাঁদে মানুষের পা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর্টেমিস-৩ মিশন বা পরবর্তী মিশনে, আর পূর্ণাঙ্গ অবতরণের জন্য লক্ষ্য ধরা হয়েছে আর্টেমিস-৪ মিশন, যার সম্ভাব্য সময়সীমা ২০২৮।

চাঁদে ফিরে যাওয়া এত সহজ নয়, কারণ:

  • নতুন ল্যান্ডার (চাঁদে নামার যান) তৈরি করতে হবে
  • উন্নত স্পেসস্যুট প্রয়োজন
  • দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য জীবনধারণ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে

এই ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিন—দুটি প্রতিষ্ঠান চন্দ্র ল্যান্ডার তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে।

চাঁদে ফিরে যাওয়ার পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, রয়েছে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারণও:

  • চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ (জল) থাকার সম্ভাবনা
  • দুর্লভ খনিজ সম্পদ
  • ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার

এছাড়া চীন-এর মতো দেশও চাঁদে মানববাহী মিশনের পরিকল্পনা করছে, যা নতুন করে মহাকাশ প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশই চাঁদের মালিক হতে পারে না। তবে ব্যবহার ও গবেষণার অধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চাঁদে ফেরার পথ শুধু প্রযুক্তির নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে।

সবশেষে বলা যায়, ১৯৬৯ সালের চাঁদজয় ছিল এক ঐতিহাসিক সূচনা। আর আজকের আর্টেমিস কর্মসূচি সেই যাত্রার নতুন অধ্যায়—যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ এখনো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0