হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, টোল বুথ’: জাহাজপ্রতি ২০ লাখ ডলার ফি
হরমুজে ‘টোল বুথ’: জাহাজপ্রতি ২০ লাখ ডলার ফি নিচ্ছে ইরান!
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জেরে তেহরান এখন এই কৌশলগত নৌপথকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই পথের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা বাধা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের জট
বর্তমানে হরমুজ প্রণালির দুই প্রান্তে প্রায় দুই হাজারের বেশি জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। নিরাপত্তা জটিলতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অধিকাংশ জাহাজই পারাপার করতে পারছে না। গত কয়েক সপ্তাহে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।
টোল আদায়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ
ইরানের পার্লামেন্ট ইতোমধ্যে প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ফি আদায়ের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তাই অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের মতো এখানেও শুল্ক আরোপ করা যৌক্তিক।
যদিও আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে বাস্তবে ইতোমধ্যেই প্রণালিতে এক ধরনের ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। জাহাজগুলোকে পারাপারের আগে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমতি নিতে হচ্ছে।
কীভাবে চলছে ‘টোল’ ব্যবস্থা
প্রণালিতে প্রবেশের আগে জাহাজগুলোকে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। এ সময় জাহাজের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম নম্বর (IMO), বহনকৃত পণ্য, ক্রু তালিকা ও গন্তব্যসহ বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়। যাচাই শেষে একটি বিশেষ ক্লিয়ারেন্স কোড দেওয়া হয়, যা ছাড়া প্রণালিতে প্রবেশ সম্ভব নয়।
পরবর্তীতে ইরানি নৌযানের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট রুট ধরে জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার হতে সহায়তা করা হচ্ছে। তবে যেসব জাহাজ যাচাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না, তাদের প্রণালিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
জাহাজপ্রতি লাখ লাখ ডলার ফি
ইরানের পার্লামেন্ট সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জাহাজের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করা হচ্ছে। এই অর্থ যুদ্ধজনিত ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
কারা পাচ্ছে অনুমতি
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জাহাজ ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের কিছু জাহাজ পারাপারের অনুমতি পেয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রায়, বিশেষ করে চীনা ইউয়ানে ফি পরিশোধের তথ্যও সামনে এসেছে। তবে ভারত সরকার দাবি করেছে, তাদের জাহাজগুলো কোনো ধরনের অর্থ প্রদান ছাড়াই পারাপার করেছে।
আইনি বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সব দেশের জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। তবে নিরাপত্তা হুমকির কারণ দেখিয়ে কোনো দেশ সীমিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল প্রশস্ত, যার মধ্যে ইরান ও ওমান—উভয় দেশের জলসীমা রয়েছে। ফলে পুরো প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে চাপ এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে অনেক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট খুঁজতে শুরু করেছে, যদিও তা সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনাই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0