ভোটকেন্দ্রে হামলা ঠেকাতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে স্ট্রাইকিং ফোর্স, কঠোর অবস্থানে প্রশাসন
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে একদিকে যেমন প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট।
অনেকেই বলেন ভোট দিতে চান, তবে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে যাবেন কি না তা নির্ভর করছে নির্বাচনের দিনের পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর। পুলিশ যে তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে, তাতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার দুই হাজার ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে এক হাজার ৬১৪টিই ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে—যা মোট কেন্দ্রের ৭৫ শতাংশেরও বেশি। সারাদেশে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রকে বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নিরাপত্তা ইস্যুতে। বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি পুনর্গঠিত হতে না পারায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা ছিল। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এবার বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রেকর্ড সংখ্যক সদস্য মাঠে রয়েছেন। অধিকাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে থাকবে বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা—যা আগের কোনো নির্বাচনে এত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়নি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে কমিশন অঙ্গীকারবদ্ধ।
বুধবার সকাল থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স, সিল ও কালিসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম কেন্দ্রে পৌঁছাতে শুরু করেছে। রাতের মধ্যে সব ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কথা রয়েছে।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। বাকি ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
এবার ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন—সাদা ব্যালটে সংসদ সদস্য নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোট। ভোট শেষে কেন্দ্রেই গণনা সম্পন্ন করে ফল ঘোষণা করা হবে এবং পরে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তা সংকলন করে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সাধারণত অতীতে সহিংসতা, ভাঙচুর বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ইতিহাস রয়েছে—এমন কেন্দ্রগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি দুর্গম পার্বত্য এলাকা, চরাঞ্চল, সীমান্তবর্তী অঞ্চল কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্রগুলোও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সীমানা প্রাচীরের অভাব বা যাতায়াত ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা থাকলেও কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রায় নয় লাখ ৫৮ হাজার সদস্যের সমন্বয়ে বিভিন্ন বাহিনী মাঠে রয়েছে। এর মধ্যে সেনাসহ এক লাখের বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সারাদেশে এক লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ সদস্য সরাসরি কেন্দ্রের নিরাপত্তায় থাকবেন এবং সহায়তায় আরও প্রায় ৩০ হাজার সদস্য যুক্ত থাকবেন। মোট পুলিশের প্রায় ৮৮ শতাংশ সদস্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন।
সাধারণ কেন্দ্রে অস্ত্রসহ দুইজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে তিন থেকে চারজন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য থাকবে। মেট্রোপলিটন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে চারজন পর্যন্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুলিশের ২৫ হাজারের বেশি বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার মধ্যে ১৫ হাজার ‘অনলাইনে’ সংযুক্ত থাকবে, যার মাধ্যমে সার্ভার স্টেশন থেকে লাইভ ভিডিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বাকি ক্যামেরাগুলো অফলাইনে ভিডিও ধারণ করবে, যা প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যাবে।
এর পাশাপাশি ড্রোন, ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিমও প্রস্তুত রয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে স্বস্তি থাকলেও বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, এসব বিষয় যথাযথভাবে মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোটের দিন সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। পুলিশের সাইবার সেলসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিষয়টি নজরদারিতে রাখছে।
সব মিলিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হলেও ভোটারদের একাংশ এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাই বলছেন। বৃহস্পতিবারের ভোটগ্রহণে এসব প্রস্তুতির কার্যকারিতা কতটা প্রমাণিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0