নারী ভোটারদের আস্থা পেতে দুই দলের ভিন্ন কৌশল
নারী ভোটারকে ঘিরে নির্বাচনী সমীকরণ: ধর্ম, প্রচারণা ও প্রত্যাশার টানাপোড়েন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। এই নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ আবার গ্রাম ও তৃণমূল পর্যায়ের। ফলে নির্বাচনের পর কোন দল সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে এই নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বড় রাজনৈতিক দলগুলো নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে আলাদা কৌশল গ্রহণ করছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তৃণমূলের নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে ঘরে ঘরে প্রচারণা, উঠান বৈঠক এবং সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ধর্মের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় বিষয় আলোচনার মাধ্যমে নারী ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। দলটির সমালোচকদের দাবি, ধর্মীয় আলোচনা বা ‘তালিম’-এর নামে দীর্ঘদিন ধরে নারীদের একত্র করে প্রচারণা চালানো হয়েছে।
যদিও জামায়াতে ইসলামী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তাদের কার্যক্রম ছিল ধর্মীয় শিক্ষামূলক এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার পর এসব কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রচারণা শুরুর পর বিএনপির দিক থেকেও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নারী ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রশ্নে উভয় দলই আলোচনায় এসেছে।
নোয়াখালী-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে উভয় দলের নারী কর্মীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। দিনের ব্যস্ততা শেষে নারীরা যখন কিছুটা অবসর পান, সেই সময়টিকে বেছে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন এবং একইসঙ্গে গণভোটের বিষয়েও কথা বলছেন। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সাংগঠনিক নির্দেশনা মেনে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে বিএনপির নারী কর্মীরাও সংগঠিতভাবে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। তারা দলীয় প্রতীক, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে গণভোট নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা না হলেও, ধর্মীয় প্রসঙ্গ তুলে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি চোখে পড়ছে। প্রচারণায় উত্তেজনার অভিযোগ নারী ভোটারদের মধ্যে প্রচারণা চালানোর সময় কিছু এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অভিযোগও উঠেছে। জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে তাদের উঠান বৈঠক ও ঘরে ঘরে প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কটূক্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
যদিও বিএনপির স্থানীয় নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। নারী ভোটারদের আশা ও সংশয় নোয়াখালী-৫ আসনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে দ্বিধা ও সংশয়। অনেকে উন্নত রাস্তাঘাট, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা চান। আবার কেউ কেউ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান। গণভোটের বিষয়টিও অনেকের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে জানা গেছে।
গ্রামীণ নারী ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেন, নির্বাচনকে ঘিরে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন কতটা হবে, তা নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর নারী ভোট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের নারী ভোটাররা একটি নির্ধারক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
ফলে তাদের সমর্থন আদায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা আরও বাড়ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধর্ম, প্রতিশ্রুতি বা চাপের পরিবর্তে নারীদের বাস্তব সমস্যা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই ভোটারদের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে।
অন্যথায়, বাড়তে পারে ভোটারদের অনিশ্চয়তা ও অংশগ্রহণে অনীহা। সব মিলিয়ে, নারী ভোটারদের মন জয় করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচেষ্টা যেমন জোরদার হচ্ছে, তেমনি এই প্রচারণার ভাষা ও কৌশল নির্বাচনী আচরণবিধির সীমার মধ্যে থাকছে কি না—সেদিকেও নজর রাখার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0