দেশে বাড়ছে হাম রোগের প্রকোপ: টিকা ঘাটতি

অপুষ্টি ও সচেতনতার অভাব বড় কারণ

Mar 30, 2026 - 21:26
 0  4
দেশে বাড়ছে হাম রোগের প্রকোপ: টিকা ঘাটতি
সংগৃহীত ছবি

দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে হাম সন্দেহে শিশু ভর্তি বাড়ছে, আর মার্চ মাসজুড়ে একাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, অপুষ্টি এবং সচেতনতার অভাব মিলিয়েই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসেই অন্তত ২০টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুতর অসুস্থ অনেক শিশুকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বছরের শুরু থেকে কয়েকশ রোগী হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছে, যাদের বেশিরভাগেরই পরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি প্রধান কারণে নতুন করে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে—

  • নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি
  • নির্ধারিত বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা
  • শিশুদের অপুষ্টি
  • মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া
  • কৃমিনাশক ওষুধ সেবনের অভাব

সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে শিশুকে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়। তবে এবার দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ ৯ মাসের আগেই সংক্রমিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি প্রতি কয়েক বছর পরপর বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের অতিরিক্ত টিকা দেওয়ার যে কর্মসূচি থাকে, তা সাম্প্রতিক সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২০২০ সালে করোনা মহামারী এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে ২০২৪ সালের নির্ধারিত টিকাদান কার্যক্রমও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা সংক্রমণ বাড়ার একটি বড় কারণ।

চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৫–১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে।

রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে—যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে বস্তি এলাকা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টির অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি এসব এলাকায় সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

  • বড় মেডিকেল কলেজগুলোতে আলাদা হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে
  • সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে
  • নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে
  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি—

  • শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো
  • পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
  • অসুস্থ শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া

এসব বিষয় মেনে চললে সংক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের কারণে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামান্য গাফিলতিই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত টিকাদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংক্রমণ রোধ করা জরুরি—নয়তো শিশুস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0