'আনন্দ' বা 'মঙ্গল' নয়, নববর্ষে চারুকলায় হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা

বৈশাখী শোভাযাত্রা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়, নাকি পুরোনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি?

Apr 5, 2026 - 17:49
 0  4
'আনন্দ' বা 'মঙ্গল' নয়, নববর্ষে চারুকলায় হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা
সংগৃহীত ছবি বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় শোভাযাত্রা

ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা ইন্সটিটিউটকে কেন্দ্র করে পহেলা বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন হিসেবে পরিচিত শোভাযাত্রাটির নাম আবারও পরিবর্তন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাম্প্রতিক ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামের পরিবর্তে এবার থেকে এর নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।

রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সরকার চায় এই আয়োজনটি নামকরণ নিয়ে বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হোক।

পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সালে, যখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে চারুকলার শিক্ষার্থীরা এটি আয়োজন করেন। পরে এটি ধীরে ধীরে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়। ২০১৬ সালে UNESCO ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে সময়ের সাথে সাথে এই নাম নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতবিরোধ দেখা দেয়। একটি অংশ ‘মঙ্গল’ শব্দটির ধর্মীয় বা আচারগত ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তোলে। সেই প্রেক্ষাপটে গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখে। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই নামও বহাল না রেখে উভয় নাম পরিত্যাগ করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামটি চূড়ান্ত করেছে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই এই আয়োজনটি হোক সব মানুষের। এখানে কোনো বিভাজন থাকবে না। তাই এমন একটি নাম নির্বাচন করা হয়েছে যা সর্বজনগ্রাহ্য এবং সাংস্কৃতিকভাবে নিরপেক্ষ।”

তিনি আরও বলেন, শোভাযাত্রায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি, বাদ্যযন্ত্র, মুখোশ, পোশাক ও ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক উপস্থিতি থাকবে। “এটি হবে আনন্দঘন, বর্ণিল এবং অংশগ্রহণমূলক একটি শোভাযাত্রা,” যোগ করেন তিনি।

নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। অনেকেই মনে করছেন, নাম পরিবর্তন করলেই বিতর্ক শেষ হবে না; বরং এটি আরও গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশ বলছেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিরোধের প্রতীক। অন্যদিকে, আরেকটি অংশ মনে করে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক এবং নতুন নামটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাম যাই হোক, এই শোভাযাত্রার মূল শক্তি এর সাংস্কৃতিক বার্তা—অসাম্প্রদায়িকতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন বছরের প্রতি আশাবাদ।

তবে নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে এই আয়োজনের ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন।

এবারের পহেলা বৈশাখে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামেই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই নাম সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং এটি সত্যিই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে কি না।

সবশেষে বলা যায়, নাম পরিবর্তন হয়তো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে মানুষের অনুভূতি, অংশগ্রহণ এবং ইতিহাসের সঙ্গে তার সংযোগের ওপর। সেই পরীক্ষাতেই এখন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0