গাড়িতে ভ্রমণের সময় ঘন ঘন বমি হয় কেন?
এই সমস্যা কী নারীদের বেশি?
গাড়ি, বাস, ট্রেন কিংবা উড়োজাহাজে উঠলেই মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি—এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে বলা হয় মোশন সিকনেস। এটি শুধু অস্বস্তিকরই নয়, দীর্ঘ ভ্রমণে কারও কারও জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ভারসাম্য রক্ষাকারী ব্যবস্থা ও চোখের দেখা দৃশ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্যই এর মূল কারণ।
মোশন সিকনেস আসলে কী?
মোশন সিকনেস হলো এমন একটি অবস্থা, যখন চলন্ত যানবাহনে থাকা অবস্থায় শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে মাথা ঘোরা, ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা এমনকি বমি পর্যন্ত হতে পারে। সড়কপথের পাশাপাশি নৌযান বা উড়োজাহাজ ভ্রমণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আমাদের শরীরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য কানের ভেতরে একটি সূক্ষ্ম ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে ভেস্টিবুলার সিস্টেম বলা হয়। চলন্ত অবস্থায় এই ব্যবস্থা শরীরের নড়াচড়া শনাক্ত করে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে যদি চোখ স্থির কোনো বস্তু—যেমন বই বা মোবাইল স্ক্রিন—দেখতে থাকে, তাহলে চোখ ও কানের সংকেতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মস্তিষ্ক এই অসামঞ্জস্য বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হয়, আর তখনই শুরু হয় বমি বমি ভাব।
ডা. মহসিন ওয়ালির মতে, “চোখ বলছে আপনি স্থির, কিন্তু কানের ব্যালেন্স সিস্টেম বলছে আপনি চলছেন—এই দ্বৈত সংকেতই মূল সমস্যা তৈরি করে।”
নিউরোলজি বিভাগের ডা. মানজারি ত্রিপাঠি বলেন, এই অসামঞ্জস্যের ফলে মস্তিষ্কের কিছু অংশ উদ্দীপিত হয়, বিশেষ করে ব্রেনস্টেম, যা বমি প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
কেন সবার ক্ষেত্রে এক নয়?
সব মানুষের ক্ষেত্রে মোশন সিকনেসের মাত্রা একরকম নয়। কেউ যাত্রার শুরুতেই অস্বস্তি অনুভব করেন, আবার কেউ দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর সমস্যায় পড়েন। উঁচু-নিচু রাস্তা, পাহাড়ি পথ, গাড়ির ঝাঁকুনি, বদ্ধ পরিবেশ বা দুর্গন্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
খালি পেটে ভ্রমণ করলে কিংবা ভারী খাবারের পর যাত্রা শুরু করলেও সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাকস্থলীর সঙ্গে যুক্ত ভেগাস নার্ভ অতিরিক্ত সংবেদনশীল হলে বমির প্রবণতা বাড়ে।
কখন সতর্ক হবেন?
সাধারণত মোশন সিকনেস সাময়িক। তবে ঘন ঘন বা অস্বাভাবিক মাত্রায় বমি হলে সেটি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কজনিত রোগ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এ ধরনের উপসর্গ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্রমণের সময় কিছু অভ্যাস বদলালে মোশন সিকনেস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়—
-
জানালা দিয়ে দূরের কোনো স্থির বস্তুর দিকে তাকান
-
চলন্ত অবস্থায় বই পড়া বা মোবাইল ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
-
যাত্রার আগে হালকা খাবার খান, অতিরিক্ত ভারী বা তৈলাক্ত খাবার নয়
-
সামনের সিটে বসার চেষ্টা করুন
-
মাথা ও শরীরের অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কমান
-
প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করুন
-
হালকা ও আরামদায়ক গান শুনলে মনোযোগ বিভ্রান্ত হয়ে অস্বস্তি কমতে পারে
নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এর পেছনে হরমোনজনিত পরিবর্তন, নিম্ন রক্তচাপ ও শারীরিক গঠনের পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। মাসিকের সময় শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্য বদলে গেলে অস্বস্তি বাড়তে পারে।মোশন সিকনেস খুব সাধারণ একটি সমস্যা হলেও এটি নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। চোখ, কান ও মস্তিষ্কের সমন্বয়ই শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে—এই সমন্বয়ে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই অস্বস্তি দেখা দেয়। সঠিক প্রস্তুতি ও কিছু সহজ কৌশল অনুসরণ করলে ভ্রমণ হতে পারে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0