মিলিটারি স্লিপ মেথড: ঘুমের সহজ সমাধান না কি নতুন বিভ্রান্তি

দুই মিনিটে ঘুম?

Feb 3, 2026 - 17:47
 0  3
মিলিটারি স্লিপ মেথড: ঘুমের সহজ সমাধান না কি নতুন বিভ্রান্তি
বিশ্বের পাঁচ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছা মানুষের চিরকালের। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঠিকভাবে ঘুমাতে পারেন না। অনিদ্রা কিংবা ঘুমাতে দেরি হওয়ার সমস্যায় ভোগেন কেউ কেউ প্রায় প্রতিদিনই। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ঘুমের সমস্যার মুখোমুখি হন।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই দ্রুত ঘুম আনার উপায় খোঁজেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নানা কৌশল ছড়িয়ে পড়ে নিয়মিত। এরই মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে তথাকথিত ‘মিলিটারি স্লিপ মেথড’—যার দাবি, মাত্র দুই মিনিটেই যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন।

টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে এই কৌশল ঘিরে তৈরি ভিডিও ইতোমধ্যে লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে। ভিডিওগুলোতে বলা হচ্ছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করলেই চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম চলে আসবে। তবে ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবি বাস্তবসম্মত নয়—বরং উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে।

এই ঘুমের কৌশলটি প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৮০-এর দশকে। মার্কিন ক্রীড়া প্রশিক্ষক লয়েড ‘বাড’ উইন্টার তার একটি বইয়ে এই পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমান চালকদের জন্য এমন কিছু কৌশল তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তারা চরম মানসিক চাপ ও ঝুঁকির মধ্যেও অল্প সময়ে বিশ্রাম নিতে পারেন।

এই পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে শরীরের বিভিন্ন অংশ শিথিল করার কথা বলা হয়। প্রথমে মুখমণ্ডল ও চোয়াল, এরপর কাঁধ, বুক, হাত, পা—সবশেষে মন থেকে চিন্তা দূর করে শান্ত কোনো দৃশ্য কল্পনা করতে বলা হয়। প্রয়োজনে মনে মনে বারবার বলা হয়, “চিন্তা করো না।”

দাবি করা হয়, নিয়মিত অনুশীলনে ছয় সপ্তাহের মধ্যে যেকোনো পরিবেশে দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমানো সম্ভব।

ঘুমবিষয়ক চিকিৎসকদের মতে, দুই মিনিটে ঘুমিয়ে পড়া কোনো স্বাভাবিক মানদণ্ড নয়। সাধারণত একজন সুস্থ মানুষের ঘুম আসতে পাঁচ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। তাই খুব দ্রুত ঘুমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “যখন কেউ নিজেকে জোর করে ঘুমাতে বাধ্য করতে চান, তখন মস্তিষ্ক উল্টো আরও সজাগ হয়ে ওঠে।” ফলে বিছানায় শুয়ে থাকা সময়টা হয়ে ওঠে বিরক্তিকর, আর ঘুম আরও দূরে সরে যায়।

তারা আরও বলেন, কেউ যদি সত্যিই দুই মিনিটে ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে সেটি দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি বা অন্য কোনো অজানা শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিলিটারি স্লিপ মেথড পুরোপুরি ভুল নয়—কিন্তু এটিকে ‘দুই মিনিটে ঘুম’ নাম দিয়ে উপস্থাপন করাটাই সমস্যা। এই পদ্ধতিতে যেসব বিষয় রয়েছে, যেমন ধাপে ধাপে পেশি শিথিল করা, ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস এবং মানসিক চাপ কমানো—এসব বহুদিন ধরেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত।

সেনাদের ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজ করার একটি বড় কারণ হলো—তারা প্রায়ই শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্ত থাকেন। তাই অল্প সময়েই তাদের ঘুমিয়ে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সেটি সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।

ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুম মানেই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া নয়। বরং দিনের বেলায় আপনি নিজেকে কতটা সতেজ, মনোযোগী ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল অনুভব করছেন—সেটাই আসল সূচক।

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, আট ঘণ্টা ঘুমানোই আদর্শ। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই ধারণা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারো জন্য ছয় ঘণ্টাই যথেষ্ট, আবার কারো জন্য নয় ঘণ্টা প্রয়োজন হতে পারে। ঘুমের চাহিদা ব্যক্তি ভেদে আলাদা এবং তা অনেকটাই জেনেটিক বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণাটি অনেকের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে।”

ঘুম বিশেষজ্ঞরা কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেন—

এতে শরীরের ভেতরের জৈবঘড়ি নির্দিষ্ট সময়েই ঘুমঘুম ভাব তৈরি করে। বিশেষ করে বিকেলের পর ন্যাপ নিলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়। ক্লান্ত না হলে বিছানায় যাওয়া উল্টো ঘুমের সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করে। বরং হালকা কিছু করুন, যখন চোখ জড়িয়ে আসবে তখন ঘুমাতে যান।

সেনাদের ঘুমের কৌশলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রুটিন ও শৃঙ্খলা। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমের আগে আলো কমানো, ফোন বন্ধ করা, বই পড়া—এসব ছোট অভ্যাস মস্তিষ্ককে জানিয়ে দেয় যে এখন বিশ্রামের সময়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত এই রুটিন মেনে চললে শরীর খুব দ্রুত এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তখন ঘুম আর কোনো লড়াই হয়ে থাকে না—বরং স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে।

দুই মিনিটে ঘুমিয়ে পড়ার মতো অলৌকিক সমাধান বাস্তবে নেই। কিন্তু ধৈর্য, বাস্তব প্রত্যাশা এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুম অবশ্যই ভালো হতে পারে। ঘুমকে জয় করার চেষ্টা না করে, বরং তাকে স্বাগত জানানোর পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0