নির্বাচন ঘিরে গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ
গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতিতে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন রিকুইজিশন করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বাণিজ্যিক গাড়ি নেওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা, ভোটের সরঞ্জাম পরিবহন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচলের জন্য অতিরিক্ত যানবাহনের প্রয়োজন হয়—এ কথা মানছেন অনেকেই।
তবে প্রশ্ন উঠছে, সরকারি গাড়ি ফাঁকা থাকার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যক্তিগত ও গণপরিবহণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি মিলিয়ে মোট চার দিনের ছুটি থাকছে। ফলে এ সময় অনেক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বাইরে থাকার কথা। তারপরও নির্বাচনের প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে গাড়ি রিকুইজিশনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন ভুক্তভোগীরা। কেউ বলছেন, একমাত্র জীবিকার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত পিকআপ বা মাইক্রোবাস অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবার কেউ অভিযোগ করছেন, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সড়কে গাড়ি আটকিয়ে কাগজপত্র নিয়ে রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—যে গাড়ির ওপর নির্ভর করে একাধিক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে, সেই গাড়ি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া কতটা ন্যায্য। ড্রাইভারদের থাকা-খাওয়া, গাড়ি কোথায় রাখা হবে, ক্ষতিপূরণ কবে ও কীভাবে দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন বা জনস্বার্থে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যানবাহন রিকুইজিশন করার ক্ষমতা প্রশাসনের রয়েছে। তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, রিকুইজিশন সর্বোচ্চ সাত দিনের জন্য হতে পারে এবং নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাশাপাশি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে গাড়ি রিকুইজিশনের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা সাধারণত রিকুইজিশন করা যাবে না। কোনো গাড়ি পূর্ব নোটিশ ছাড়া নেওয়া যাবে না, একনাগাড়ে সাত দিনের বেশি রাখা যাবে না এবং ছয় মাসের মধ্যে একই গাড়ি দ্বিতীয়বার নেওয়া নিষিদ্ধ। রিকুইজিশন করা গাড়ির জ্বালানি, চালকের খাবার খরচ এবং কোনো ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
নিয়ম মানা হচ্ছে না বাস ও রেন্ট-এ-কার সংশ্লিষ্ট মালিকরা অভিযোগ করছেন, বাস্তবে এসব নির্দেশনার অনেকটাই মানা হচ্ছে না। কোথাও নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না করে গাড়ি নেওয়া হচ্ছে, কোথাও ক্ষতিপূরণ বা ভাড়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। পরিবহন মালিকদের দাবি, একটি দূরপাল্লার গাড়ি এক সপ্তাহ রিকুইজিশনে থাকলে মালিকের অন্তত কয়েক দশ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। আগে যেখানে ভাড়া, স্টাফদের বেতন ও জ্বালানি খরচের বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকত, এবার তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কারণেই নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত গাড়ি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বিপুলসংখ্যক সদস্য মাঠে থাকেন এবং এসব গাড়ি বিভিন্ন বাহিনী ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয়। তাদের দাবি, গাড়িগুলো শুধুমাত্র নির্বাচনী দায়িত্বেই ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় খরচ বহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে তবে বাস্তব চিত্র ও আইনি নির্দেশনার মধ্যে ফারাক থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—রিকুইজিশনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, ক্ষতিপূরণ আদৌ মিলবে কি না এবং ব্যক্তিগত জীবিকা সুরক্ষার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য জবাব না এলে গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে আতঙ্ক ও অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0