কোন পরিস্থিতিতে ভোট বন্ধ করতে পারে নির্বাচন কমিশন?
আইন, নজির ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ
গাজী আরমানঃ- জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ভোটারদের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। তার মধ্যে অন্যতম—কোনো আসনে হঠাৎ করে ভোট বন্ধ বা স্থগিত ঘোষণা করা হলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কি সেই ক্ষমতা আছে? বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে ভোটগ্রহণ বন্ধ, স্থগিত কিংবা বাতিল করার নজির একাধিকবার রয়েছে।
আইনি ভিত্তি: আরপিও’র ৯১(ক) ধারা
ভোট বন্ধ বা বাতিলের ক্ষমতা এসেছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকে, যা নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন। ১৯৭২ সালে প্রণীত এ আইনে সময়ের সঙ্গে একাধিক সংশোধন আনা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন করা হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের সংশোধনীতে বলা হয়েছিল, কোনো কেন্দ্রে বড় ধরনের অনিয়ম বা সহিংসতার প্রমাণ মিললে ইসি সেই কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে পুনঃভোটের নির্দেশ দিতে পারবে, তবে পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা থাকবে না। তখন ‘নির্বাচন’ শব্দের পরিবর্তে ‘ভোটগ্রহণ’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ইসির ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছিল—অর্থাৎ কেবল ভোটের দিন ভোট বন্ধ করার সুযোগ ছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের সংশোধনীতে সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়। এখন তফসিল ঘোষণার পর থেকে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত, প্রয়োজন মনে করলে ইসি যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচন বন্ধ বা বাতিল করতে পারে। অর্থাৎ প্রচারণা চলাকালীন সময়েও গুরুতর অনিয়ম, সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার প্রমাণ মিললে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে।
কখন কেন্দ্রের ভোট বন্ধ হতে পারে?
কোনো ভোটকেন্দ্রে যদি প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতি চলে যায়—যেমন ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ব্যালটে আগাম সিল মারা, জোরপূর্বক ভোট প্রদান বা ভয়ভীতি প্রদর্শন—তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করতে পারেন।
যদি তিনি তা না করেন এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে আসে, তাহলে কমিশন রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে সেই কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করতে পারে।
পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষেত্র
কোনো আসনের একাধিক কেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ মিললে, কিংবা সিসি ক্যামেরা বা অন্যান্য সূত্রে ভোটের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে, ইসি পুরো আসনের ভোট বাতিল করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়।
এমন পরিস্থিতিও হতে পারে, যখন আইনশৃঙ্খলা এতটাই অবনত হয় যে ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারছেন না। সেক্ষেত্রেও কমিশন পুরো আসনের ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রয়োজনে কোনো পক্ষপাতদুষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সরিয়েও নির্বাচন প্রক্রিয়া সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া যায়।
‘স্থগিত’ ও ‘বাতিল’-এর পার্থক্য
ভোট চলাকালে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে—যেমন মারামারি, ককটেল বিস্ফোরণ বা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া—কিন্তু ব্যালট বাক্স ও কাগজপত্র অক্ষত থাকলে, তখন সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ভোট শুরু করা যায়।
অন্যদিকে গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে ভোট বাতিল করা হয় এবং পরে পুনঃভোট আয়োজন করা হতে পারে।
অতীতের কিছু নজির
২০২২ সালে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে পুরো নির্বাচন বাতিল করা হয় এবং পরে পুনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হলে ২০২৩ সালে আইনে পরিবর্তন এনে পুরো আসন বাতিলের ক্ষমতা সীমিত করা হয়। তবে ২০২৫ সালের সংশোধনীতে সেই ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ২০২৩ সালের কয়েকটি উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রের ফল স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছিল। ফলাফলে প্রভাব না পড়ায় বাদ দেওয়া কেন্দ্রগুলোর ভোট ছাড়াই গেজেট প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশে একবার পুরো জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল ২০০৭ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপটে তৎকালীন নির্বাচন স্থগিত করা হয়। তবে সেটি নির্বাচন কমিশনের একক সিদ্ধান্ত ছিল না; সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থার কারণে তা কার্যকর হয়।
ক্ষমতা ফিরে পাওয়া কতটা ইতিবাচক?
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন আগের মতো বিস্তৃত ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। এখন প্রয়োজনে আসনভিত্তিক বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্বাচন বন্ধ করার সুযোগ রয়েছে।
তাদের মতে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার না হলে এই ক্ষমতা কমিশনের জন্য ইতিবাচক, কারণ এতে অনিয়ম দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। তবে এ ক্ষমতার প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের হাতে ভোট বন্ধ, স্থগিত বা বাতিল করার সুস্পষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। তবে তা নির্ভর করে পরিস্থিতির গুরুত্ব, প্রমাণের ভিত্তি এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0