রিয়েলিটি শোর আড়ালে: যৌন নিপীড়ন ও বডি শেমিংয়ের অন্ধকার অধ্যায়
রিয়েলিটি শো ‘আমেরিকাস নেক্সট টপ মডেল’-এর অন্ধকার অধ্যায়: যৌন নিপীড়ন, বডি শেমিং ও মানসিক চাপ
নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘রিয়েলিটি চেক: ইনসাইড আমেরিকাস নেক্সট টপ মডেল’, যা দীর্ঘদিন আলোচিত-সমালোচিত রিয়েলিটি শো আমেরিকাস নেক্সট টপ মডেল (এএনটিএম)-এর অন্তরালের গল্প উন্মোচন করে। মোর লুসলি ও ড্যানিয়েল শিবানের নির্মিত এই সিরিজে উঠে এসেছে শো পরিচালনা ও প্রযোজনা প্রক্রিয়ার অন্ধকার দিক, যেখানে যৌন নিপীড়ন, বডি শেমিং, অপমান ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
শোটি ২০০৩ সালে সুপারমডেল টাইরা ব্যাঙ্কস দ্বারা তৈরি হয়ে ২৪ মৌসুম ধরে তিনটি ভিন্ন নেটওয়ার্কে সম্প্রচারিত হয়। তথাপি, তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, গ্ল্যামারের আড়ালে প্রতিযোগীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা প্রাধান্য পায়নি।
কাস্টিং ও বৈচিত্র্যে অসঙ্গতি
প্রথম মৌসুম থেকেই বৈচিত্র্যময় কাস্টিং নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। প্রযোজক কেন মর্ক জানান, লুসি মুনভেস নামের নেটওয়ার্ক প্রধান এক লাতিন প্রতিযোগীর অন্তর্ভুক্তি আটকে দিয়েছিলেন। প্রথম মৌসুমের প্রতিযোগী এবনি হেইথ অভিযোগ করেছেন, তাঁকে ক্যামেরার সামনে ‘রাগী’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ আখ্যা দিয়ে মানসিকভাবে নিগ্রস্ত করা হয়েছিল। ফটোশুটের সময় তাঁর মাথায় তিনটি টাকের দাগ তৈরি হয়, যা মানসিকভাবে তাকে ভেঙে দেয়।
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রতিযোগী শ্যান্ডি সুলিভান বলেন, মিলানে শুটিং চলাকালে তিনি ‘ব্ল্যাকআউট’ অবস্থায় ছিলেন এবং পরে ঘটে যাওয়া যৌন সম্পর্কের দৃশ্যকে ‘প্রেমিককে প্রতারণা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রযোজনা দল তাকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়, এবং পরবর্তীতে সেই ফুটেজ আবারও সম্প্রচারিত হয়, যদিও তিনি স্পষ্টভাবে তা দেখতে চাননি।
শোর বিভিন্ন ফটোশুটও সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিযোগীদের কাঁচা মাংস পরে ছবি তুলতে বলা হয়, বা গৃহহীন নারীর চরিত্রে বা অপরাধস্থলের মৃতদেহ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিযোগী জিসেল স্যামসন ও হিলের ওপর শরীর নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছিল, যা তাঁদের মানসিক ও আত্মসম্মানিকভাবে প্রভাবিত করেছে।
ষষ্ঠ মৌসুমের বিজয়ী ড্যানিয়েল ইভান্স জানান, টাইরা তাঁকে দাঁতের ফাঁক বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন। জয়ী হওয়ার পরও মডেল হিসেবে প্রত্যাশামতো সুযোগ পাননি, কারণ এজেন্টদের দৃষ্টিতে ‘টপ মডেল’ শো থেকে আসা মডেলদের আলাদাভাবে সামলাতে হয়।
২০১২ সালে রেটিং কমতে থাকায় শোর প্রধান কর্মকর্তারা, জে ম্যানুয়েল, জে অ্যালেকজান্ডার ও বিচারক নাইজেল বার্কারকে বরখাস্ত করেন। ম্যানুয়েল অভিযোগ করেছেন, তিনি আগেই শো ছাড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি।
২০২২ সালের মিস জে স্ট্রোকের ঘটনা তথ্যচিত্রে আবেগঘনভাবে দেখানো হয়েছে। পাঁচ সপ্তাহ কোমায় থাকার পর হাঁটতে বা কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, “আমি মডেলদের হাঁটা শেখাতাম। এখন নিজেই হাঁটতে পারি না।”
তথ্যচিত্রের শেষে টাইরা ব্যাঙ্কস জানান, “আমার কাজ শেষ হয়নি। নতুন কী পরিকল্পনা আছে, তা সবাই জানে না।” প্রশ্ন থেকে যায়, নতুন মৌসুম অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে কি না, নাকি আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে।
তথ্যচিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হলেও, মডেলদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি রিয়েলিটি শো নির্মাণে কতটা প্রাধান্য পায়, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0