ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু এবং পাকিস্তানের শীর্ষ মহলে তোলপাড়
ওসামা বিন লাদেন
গাজী আরমানঃ ২০১১ সালের ২ মে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় মোড় তৈরি করেছিল। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর গোপন অভিযানে এই আল-কায়েদা প্রধানের মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বহু বিশ্লেষণ হলেও, পাকিস্তানের ভেতরের প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিল।
সম্প্রতি ফারহাতুল্লাহ বাবর রচিত The Zardari Presidency: Now It Must Be Told বইয়ে উঠে এসেছে সেই অজানা অধ্যায়—যেখানে দেখা যায়, অভিযানের পর পাকিস্তানের শীর্ষ প্রশাসন এক ধরনের চরম বিভ্রান্তি, উদ্বেগ ও সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে পড়ে যায়।
ঘটনার দিন ভোরে প্রেসিডেন্টের দপ্তরে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়। সাধারণত বিকেলে কাজ শুরু করতেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি, তাই এমন তড়িঘড়ি ডাকেই বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।
এদিকে রাতেই অ্যাবোটাবাদের আকাশে রহস্যজনক হেলিকপ্টার চলাচল ও একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কিছু কর্মকর্তাকে সন্দেহে ফেলে। তারা বুঝতে পারেন, এটি দেশের নিজস্ব কোনো অভিযান নয়।
অভিযান শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সরাসরি ফোন করেন জারদারিকে। নিজের স্মৃতিকথা A Promised Land-এ ওবামা উল্লেখ করেন, পাকিস্তানকে না জানিয়ে অভিযান চালানো ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও দ্রুত যোগাযোগ করা হয় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আশফাক কায়ানি-এর সঙ্গে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান মাইক মুলেন তাকে জানান যে, অভিযান সফল হয়েছে এবং বিন লাদেন নিহত। পরে সিআইএ প্রধান লিওন পানেটা-ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
প্রেসিডেন্ট ভবনে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে মূল প্রশ্ন ছিল—কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে খোঁজাখুঁজির মানুষটি পাকিস্তানের সেনানিবাস এলাকার এত কাছে বছরের পর বছর বসবাস করলেন?
ফারহাতুল্লাহ বাবর তার বইয়ে উল্লেখ করেন, তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন—এটি কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নাকি কোনো ধরনের গোপন সহযোগিতা?
কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। বরং আলোচনায় দেখা যায়, শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে।
অভিযানের প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর প্রথম সরকারি প্রতিক্রিয়া আসে, যা ছিল অস্পষ্ট ও রক্ষনাত্মক। সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতার কথা বলছিল, অন্যদিকে নিজেদের ব্যর্থতার বিষয়টি স্বীকার করেনি।
এই সময় পাকিস্তানের গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক মহল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে সরকার ও সামরিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে। প্রেসিডেন্ট জারদারি The Washington Post-এ একটি নিবন্ধ লিখে দাবি করেন, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে সমালোচকরা বলেন, এই অবস্থান বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মূলত সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা।
অভিযানের পর একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন—অ্যাবোটাবাদ কমিশন—গঠন করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা কমিশনের সামনে হাজির না হওয়ায় প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়। পরে রিপোর্ট ফাঁস হলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানান, পাকিস্তানকে আগাম জানানো হয়নি কারণ তাদের ওপর আস্থা ছিল না। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্কেও স্পষ্ট টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অ্যাবোটাবাদ অভিযান শুধু একজন সন্ত্রাসী নেতার মৃত্যুই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা, রাজনৈতিক দ্বিধা এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরে।
ফারহাতুল্লাহ বাবরের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই দিন পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল বিভ্রান্ত, চাপের মধ্যে এবং নিজেদের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত—যেখানে সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
Tags:
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0