ফ্যাসিবাদের পতন হলেও বদলায়নি দোসরদের আচরণ, রেজিস্ট্রি দলিলের পরও জমির দখলে বাধা

রেজিস্ট্রি দলিলের পরও জমির দখল মিলছে না

Aug 16, 2026 - 01:45
 0  44
ফ্যাসিবাদের পতন হলেও বদলায়নি দোসরদের আচরণ, রেজিস্ট্রি দলিলের পরও জমির দখলে বাধা

তেজতুরী বাজারে ৫৭ লাখ টাকার জমি ক্রয়, উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে সাব-কবলা রেজিস্ট্রির পরও দখলে বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর তেজতুরী বাজার এলাকায় জমি ক্রয় করে বৈধভাবে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার পরও দখল বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জমির ক্রেতা আবুল কাশেমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গুরুতর হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে।

প্রাপ্ত দলিলপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালে তেজতুরী বাজার এলাকায় প্রায় ৮৩ অযুতাংশ জমি ক্রয়ের জন্য আবুল কাশেম ও জমির মালিক অতুলের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন হয়। জমিটির মোট মূল্য নির্ধারিত হয় ৫৭ লাখ টাকা। চুক্তির সময় ক্রেতা আবুল কাশেম ১০ লাখ টাকা বায়না হিসেবে পরিশোধ করেন।

পরবর্তীতে জমির মালিক অতুল মৃত্যুবরণ করলে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর মেয়ে জুলিয়েটের কাছ থেকে অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে সাব-কবলা রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন করেন আবুল কাশেম। অর্থাৎ ক্রয়সংক্রান্ত বায়না, অর্থ পরিশোধ এবং পরবর্তী রেজিস্ট্রির ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রে প্রতীয়মান হয়।

আবুল কাশেমের অভিযোগ, জমির নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন করার পর তিনি যখন ক্রয়কৃত সম্পত্তির দখল নিতে যান, তখন মৃত অতুলের ভাই শংকর ও তাঁর স্ত্রী প্রভা জমিতে প্রবেশে বাধা দেন।

তাঁদের বক্তব্য হিসেবে আবুল কাশেম জানিয়েছেন, অতুলের কাছে শংকর ও প্রভা আর্থিকভাবে পাওনাদার ছিলেন। সেই পাওনার দাবি দেখিয়েই তাঁরা জমিটি নিজেদের দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ।

তবে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পর্যালোচনায় আবুল কাশেমের দাবি অনুযায়ী, তিনি জমিটির ক্রয়মূল্য পরিশোধ করে উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে যথাযথ রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। ফলে মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিগত দেনা-পাওনার বিরোধের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি ও রেজিস্ট্রি হয়ে যাওয়া সম্পত্তির দখল নিয়ে নতুন বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিরোধের জেরে তেজতুরী বাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনার পর আবুল কাশেমকে তাঁর ক্রয়কৃত জমি বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কিন্তু সালিশের সিদ্ধান্তের পরও জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আবুল কাশেম। বরং তাঁকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি। বিশেষ করে দলিল-দস্তাবেজের ভিত্তিতে যদি কোনো পক্ষের স্বত্ব বা অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে জোরপূর্বক দখল ধরে রাখা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

আবুল কাশেমের আরও অভিযোগ, প্রভা অতীতে তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং সেই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা বলে তাঁকে ভয় দেখানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাঁকে জমি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি তাঁকে গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে কারও কাছে ব্যক্তিগত পাওনা থাকলে সেই পাওনা আদায়ের জন্য যথাযথ আদালত বা আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পাওনার দাবি নিজে থেকেই অন্য ব্যক্তির নামে সম্পাদিত বৈধ রেজিস্ট্রি দলিলকে বাতিল করে দেয় কি না—তা নির্ভর করবে দলিলের বৈধতা, মালিকানার ধারাবাহিকতা, অর্থ লেনদেন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির ওপর।

এ ক্ষেত্রে আবুল কাশেমের দাবি অনুযায়ী, তিনি প্রথমে বায়না বাবদ ১০ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে নির্ধারিত মোট মূল্যের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করেছেন। এরপর উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে সাব-কবলা রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। ফলে তাঁর ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্রকে পাশ কাটিয়ে কেবল মৃত অতুলের কাছে পাওনা থাকার দাবির ভিত্তিতে জমির দখল ধরে রাখার বিষয়টি আইনগতভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

আবুল কাশেম বলেন, তিনি কোনো ধরনের সংঘাত বা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চান না। তাঁর বক্তব্য, তিনি তাঁর অর্থ দিয়ে জমি কিনেছেন, প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন করেছেন। এখন তিনি কেবল আইনানুগভাবে তাঁর সম্পত্তির দখল বুঝে নিতে চান।

তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জমির দখল নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের আইনসম্মত নিষ্পত্তি দাবি করেছেন।

আবুল কাশেমের হাতে থাকা বায়না সংক্রান্ত কাগজপত্র, অর্থ পরিশোধের তথ্য এবং পরবর্তী রেজিস্ট্রি দলিলের ধারাবাহিকতা তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করে বলে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে।

একই সঙ্গে ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ জমি সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি আদালত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়াই প্রত্যাশিত; ব্যক্তিগত প্রভাব বা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো পক্ষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ থাকলে সেটিও আইনের আওতায় তদন্তের দাবি রাখে।

এ ব্যাপারে জানতে প্রভাকে কয়েক বার তার মুঠো ফোনে ফোন করলেও তা সচল পাওয়া যায় নি।

তেজতুরী বাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সব দলিলপত্র, রেজিস্ট্রি নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং সালিশের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দ্রুত একটি শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে আবুল কাশেমের অভিযোগ অনুযায়ী তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

এখন দেখার বিষয়, বৈধ দলিল ও সালিশি সিদ্ধান্তের পরও যে দখল-জটিলতা তৈরি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি কীভাবে নিরসন করে এবং ক্রেতা আবুল কাশেম তাঁর ক্রয়কৃত সম্পত্তির শান্তিপূর্ণ দখল শেষ পর্যন্ত বুঝে পান কি না।

প্রাসঙ্গিক আইনি বিধান

Transfer of Property Act, 1882-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী বিক্রয় হলো মূল্যের বিনিময়ে মালিকানা হস্তান্তর। একই আইনের ৫৪এ ধারা স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি নিবন্ধনের বিষয়ে বিধান দেয়। এছাড়া Registration Act, 1908-এর ১৭এ ধারা নিবন্ধিত বিক্রয়চুক্তির বিষয়ে প্রাসঙ্গিক।

দখল নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে Specific Relief Act, 1877-এর ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধারের দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়া যায়।

অন্যদিকে, ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে অন্যের দখলে থাকা সম্পত্তিতে বেআইনি প্রবেশ বা অবস্থানের ক্ষেত্রে Penal Code, 1860-এর ৪৪১ ও ৪৪৭ ধারা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0