কবর থেকে ফিরে সহপাঠীদের ভিড়ে মেয়েকে খুঁজে ফেরেন অসহায় বাবা

কবরের মাটি শুকাতে না শুকাতেই স্কুলে বাবার আর্তনাদ

May 21, 2026 - 21:42
 0  3
কবর থেকে ফিরে সহপাঠীদের ভিড়ে মেয়েকে খুঁজে ফেরেন অসহায় বাবা
রামিসার সহপাঠীদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছোট্ট রামিসা আক্তারকে কবর দেওয়ার পরদিনই তার সহপাঠীদের মাঝে গিয়ে মেয়েকে খুঁজলেন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। বৃহস্পতিবার তিনি মিরপুরের পপুলার মডেল স্কুলে গিয়ে মেয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে বসে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি—হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।

শ্রেণিকক্ষের সেই মুহূর্ত যেন শোকের এক গভীর আবহ তৈরি করে। রামিসার সহপাঠীরা, যারা কয়েকদিন আগেও তার সঙ্গে খেলেছে, পড়েছে, তারা ঘিরে ধরে রামিসার বাবাকে। শিশুরা নিজেরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিক্ষকরাও এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনায় প্রাণ হারায় ৮ বছর বয়সি রামিসা আক্তার। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া আসামি সোহেল রানা প্রাথমিক জবানবন্দিতে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এই ঘটনায় সারাদেশে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে এশার নামাজের পর রামিসার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় স্থানীয়দের ঢল নামে, অনেকেই দোষীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

মেয়েকে দাফন শেষে ঢাকায় ফিরে আসেন আবদুল হান্নান মোল্লা। শোকের ভার নিয়েই তিনি পরদিন মেয়ের স্কুলে যান। কিছুক্ষণ সময় কাটান তার সহপাঠীদের সঙ্গে। এই সময় তিনি যেন প্রতিটি শিশুর মাঝেই নিজের মেয়েকে খুঁজে ফিরছিলেন।

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে বিচারব্যবস্থা নিয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে তিনি বলেন, বিচার পাওয়ার প্রতি তার আস্থা নেই। তার ভাষায়, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে এমন ঘটনার বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে এবং একসময় তা চাপা পড়ে যায়।

এই ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করেছেন তিনি নিজেই। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি জবানবন্দিতে অপরাধ স্বীকার করেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় সোহেল তার স্ত্রীকে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল। পরে মরদেহ গুমের প্রস্তুতিকালে স্থানীয়রা টের পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়লে সোহেল জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকেই স্বপ্নাকে আটক করা হয়।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালো হচ্ছে। একইসঙ্গে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0