জ্বালানি তেল নিয়ে মজুতদারির অভিযোগ, কিন্তু দায় কার

জ্বালানি তেল নিয়ে মজুতদারির অভিযোগ, কিন্তু দায় কার

Mar 28, 2026 - 18:10
 0  3
জ্বালানি তেল নিয়ে মজুতদারির অভিযোগ, কিন্তু দায় কার
প্রতীকী ছবি

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি অংশীদার না হলেও এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা, হঠাৎ সংকটের চিত্র এবং বিভিন্ন স্থানে মজুতদারির অভিযোগ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সরকার বলছে, সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি না থাকলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’-এর কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সারা দেশের পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে “ট্যাগ অফিসার” নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি স্টেশনের বিক্রি, মজুত এবং সরবরাহ পরিস্থিতি সরাসরি নজরদারিতে রাখা হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) কঠোরভাবে মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সীমান্ত ও ডিপোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি

তেল পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ৯টি জেলায় অবস্থিত ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ডিপোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সীমান্তপথে তেল পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা ঠেকাতে এই উদ্যোগ।

সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, কেউ যদি তেলের অবৈধ মজুত বা পাচারের তথ্য দিতে পারে, তাহলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এতে সাধারণ মানুষকেও এই অভিযানে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মজুতের চাঞ্চল্যকর তথ্য

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে মজুতকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। কোথাও আবাসিক ভবনের ভেতরে গোপন ট্যাংক স্থাপন করে হাজার হাজার লিটার তেল জমা রাখা হয়েছে, আবার কোথাও খোলা জায়গা বা গোয়ালঘরে ড্রামভর্তি তেল লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম, নাটোর, শেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এদিকে কোথাও কোথাও অভিযোগ উঠেছে, একই ব্যক্তি বা যানবাহন একাধিকবার তেল কিনে তা জমা করছে, যা বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি

তবে ফিলিং স্টেশন মালিকদের সংগঠন এসব অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, পেট্রোল পাম্পে বড় আকারে তেল মজুত রাখার সুযোগ নেই এবং সরকার চাইলে সহজেই তা যাচাই করতে পারে। তাদের মতে, হাজার হাজার স্টেশনের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনায় পুরো খাতকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।

কেন তৈরি হচ্ছে এই পরিস্থিতি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ একসাথে কাজ করছে—

  • আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা
  • যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
  • গুজব ও তথ্যের ঘাটতি
  • অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা বলছেন, সরবরাহ ও মজুতের তথ্য প্রতিদিন স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে মানুষের আতঙ্ক কমতো এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

আইনে রয়েছে কঠোর শাস্তি

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা দীর্ঘমেয়াদি সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অর্থদণ্ড এবং মজুতকৃত পণ্য বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে আদালতের।

ঝুঁকিপূর্ণ মজুত: প্রাণহানির আশঙ্কা

সরকার সতর্ক করে বলেছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় বাসা বা অনিরাপদ স্থানে এগুলো সংরক্ষণ করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে, যা শুধু সম্পদ নয়, প্রাণহানির কারণও হতে পারে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বিশ্লেষকদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পখাত—বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক খাত তখন বিকল্প জ্বালানির সংকটে পড়তে পারে।

তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মজুত বন্ধ করা, গুজব এড়িয়ে চলা এবং আইন মেনে চলার মাধ্যমেই এই সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0