ঘরে ঘরে মাথাব্যথা, চোখ ও ঘাড়ের যন্ত্রণা: ভাইরাস না ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব?
ঘরে ঘরে মাথাব্যথা, চোখ ও ঘাড়ের যন্ত্রণা: ভাইরাস না ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব?
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাথাব্যথা, চোখের পেছনে চাপ এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অফিস, বাসা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই একই ধরনের উপসর্গের কথা শোনা যাচ্ছে। অনেকেই বিষয়টিকে সাধারণ ঠান্ডা বা ক্লান্তি হিসেবে দেখলেও, চিকিৎসকরা বলছেন—এটি মূলত মৌসুমি ভাইরাস সংক্রমণ ও আবহাওয়াজনিত শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে ভাইরাল জ্বরের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার প্রধান উপসর্গ হিসেবে মাথা, ঘাড় ও চোখের ব্যথা দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হচ্ছে, যা কোভিড মহামারির শুরুর দিকের উপসর্গের সঙ্গে কিছুটা মিল রাখে।
নাক-কান-গলা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, এই সময় বাতাসে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি), ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস ও অ্যাডিনোভাইরাস সক্রিয় থাকে। এসব ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটালেও এর প্রভাব মাথা, ঘাড় ও চোখের আশপাশের পেশি ও স্নায়ুতেও পড়ে।
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাথাব্যথা, চোখের কোটরে ব্যথা, ঘাড়ে টান, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া ও জ্বর—এসব ভাইরাল সংক্রমণের পরিচিত উপসর্গ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো নতুন কোনো ভাইরাসের লক্ষণ নয়; বরং পরিচিত ভাইরাসগুলোর মৌসুমি সক্রিয়তার ফল। তবে হঠাৎ করে উপসর্গের সংখ্যা বাড়ায় ভাইরাসের আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষানিরীক্ষা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
ঋতু পরিবর্তনের ফাঁদ শীত ও বসন্তের সন্ধিক্ষণের এই সময়টাকে চিকিৎসকরা বরাবরই ‘সংবেদনশীল মৌসুম’ বলে থাকেন। দিনে রোদের উষ্ণতা, রাতে বা ভোরে ঠান্ডা বাতাস—এই দ্রুত তাপমাত্রা পরিবর্তন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। বৃষ্টি কম থাকায় বাতাসে ধুলোবালি, পরাগরেণু ও জীবাণুর পরিমাণ বেড়ে যায়।
এর ফলে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, সাইনাসের প্রদাহ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। নাক বন্ধ হয়ে গেলে সাইনাসের ভেতরে চাপ তৈরি হয়, যা কপাল ও চোখের চারপাশে তীব্র ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সাইনাস হেডেক’। শরীরের ভেতরের পরিবর্তন চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঠান্ডা আবহাওয়ায় মাথার ভেতরের রক্তনালিগুলো সঙ্কুচিত হয় এবং উষ্ণতায় আবার প্রসারিত হয়। এই বারবার সঙ্কোচন-প্রসারণ মাথার ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে, যা মাথাব্যথার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া শীতকালে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তৃষ্ণা কম লাগায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন। এই ডিহাইড্রেশনও মাথাব্যথার একটি বড় কারণ। ঘাড় ও কাঁধের পেশি ঠান্ডার কারণে শক্ত হয়ে যায়। সেই শক্ত পেশি থেকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে মাথার দিকে। ভাইরাস সংক্রমণে ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে গেলে ঘাড় আরও শক্ত হয়ে ব্যথা বাড়তে পারে। জীবনযাপনের প্রভাব দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের অভ্যাসও ঘাড় ও মাথাব্যথাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে স্ক্রিন দেখার ফলে ‘টেক্সট নেক’ সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে অনিয়মিত ঘুম যোগ হলে মাইগ্রেন ও ক্রনিক মাথাব্যথার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। চোখের পাওয়ারে সমস্যা বা অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখের কোটরে চাপ পড়লেও ব্যথা হতে পারে, যা অনেক সময় ভাইরাসজনিত উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এই সময়ে ভাইরাস সংক্রমণে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এ ছাড়া যাদের হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ জটিল আকার নিতে পারে। কী করণীয়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ভাইরাল সংক্রমণ নিজে থেকেই সেরে যায়।
তবে উপসর্গ বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান, গরম কাপড় ব্যবহার, ঘাড়ে হালকা গরম সেঁক, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরে ঘরে মাথা, ঘাড় ও চোখের ব্যথার এই চিত্র আসলে শরীর ও পরিবেশের একটি সম্মিলিত সতর্ক সংকেত। এই সময় অকারণ আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও যত্নই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0