দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার
আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ৬০ হাজার
দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম সংক্রমণের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ক্রমবর্ধমান এই পরিস্থিতিতে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা গ্রহণ না করা, অপুষ্টি, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হাম সংক্রমণের কারণে হয়েছে।
এছাড়া আরও ৩৬৩ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, যাদের অনেকের নমুনা পরীক্ষা বা পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি।
বুধবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য বিভাগের বিবৃতিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় একজন নিশ্চিত হাম রোগী এবং সাতজন সন্দেহজনক হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সারাদেশে নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৫০ জনে। পাশাপাশি সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৩ হাজার ৫৬ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও সব রোগী শনাক্ত বা নিবন্ধিত হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে ছিল অথবা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।
হাম আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত শিশু ভর্তি বাড়ছে।
বিশেষ করে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অনেক জায়গায় আইসিইউ ও বিশেষায়িত শয্যার সংকটও দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি কারণে নতুন করে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে—
- নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি
- বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা
- অপুষ্টি ও দারিদ্র্য
- জনসচেতনতার অভাব
- ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ
বিশেষ করে করোনা মহামারির পর নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং কিছু এলাকায় টিকা সংকট পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে দেশের কয়েকটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে আলাদা হাম কর্নার, আইসিইউ প্রস্তুত এবং চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একাধিক শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
তারা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—
- সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে
- জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে
- আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে
- শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন নিশ্চিত করতে
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম আবারও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিন বাড়তে থাকা মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত ব্যাপক টিকাদান, কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0