মুসলমান হয়ে আমরা কি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি', প্রশ্ন আসামের মুসলমানদের
যে যেভাবে পারবেন, মুসলমানদের হেনস্থা করুন; মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা
আসামে ‘মিঞাঁ’ তকমা, বাংলাভাষী মুসলমানদের
গাজী আরমানঃ- আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাষ্য ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার একের পর এক আক্রমণাত্মক মন্তব্য—যেখানে ‘মিঞাঁ’ শব্দটি ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিশানা করা হচ্ছে—সেই পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে।
‘মিঞাঁ’ শব্দটি আসামে বহুদিন ধরেই অবমাননাকর অর্থে বাংলাভাষী মুসলমানদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শব্দটি রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হওয়ায় তা রাজনৈতিক বৈধতা পাচ্ছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
গত বছরের ২০ নভেম্বর, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন ঘোষণার পর মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
“যতদিন আমি মুখ্যমন্ত্রী থাকব, ততদিন কোনো মিঞাঁ মুসলমানদের শান্তিতে থাকতে পারবে না। সন্দেহভাজন নাগরিকদের হয়রানি করাই আমার দায়িত্ব।”
এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“যেভাবে পারো মুসলমানদের কষ্ট দাও। রিকশাভাড়া পাঁচ টাকা চাইলে চার টাকা দেবে। হেনস্তা হলে তারা আসাম ছেড়ে চলে যাবে।”
এই বক্তব্যগুলো আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে একটি সুস্পষ্ট মেরুকরণমূলক কৌশলের ইঙ্গিত দেয় বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
বাস্তবতার মুখোমুখি মিনারা বেগম
এই রাজনৈতিক ভাষ্যের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ৫১ বছর বয়সি মিনারা বেগমের কণ্ঠে সেই বাস্তবতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি বলেন, “আমরা কি মুসলমান বলেই অপরাধী? সরকার যদি চায়, তাহলে সরাসরি মেরে ফেললেই তো পারে। এত অপমান আর ভয় দেখিয়ে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়া সহজ।”
মিনারা বেগমের পরিবার প্রায় ৪০ বছর ধরে যে জমিতে বসবাস করছিল, সেটিকে ‘সরকারি জমি’ দেখিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। বর্তমানে তিনি অন্যের জমিতে অস্থায়ী প্লাস্টিকের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক।
“নোটিশ পাওয়ার পর একাধিকবার শুনানিতে গেছি। সব কাগজ জমা দিয়েছি। তবু প্রতিদিন ভয়—১০ ফেব্রুয়ারি কী হবে?” বলেন তিনি।
১০ ফেব্রুয়ারি আসামের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা। এই দিনটিকে ঘিরে বাংলাভাষী মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, এই প্রক্রিয়া কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়ার জন্য নয়। হোজাই জেলার ডেপুটি কমিশনার বিদ্যুৎ বিকাশ ভগবতী বলেন, “বিশেষ সংশোধন একটি আইনি প্রক্রিয়া। যাদের স্থায়ী ঠিকানা নেই, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সমস্যা হতে পারে। যোগ্য নাগরিকদের বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নেই।” তবে বাস্তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, যমুনা-মৌডাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ১৭০০-র বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বলছে, এদের অনেকেই ইতিমধ্যে ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম-৪ জমা দিয়েছেন।
কিন্তু নাগরিক অধিকার কর্মীদের প্রশ্ন— যে সরকার নিজেই উচ্ছেদ করছে, সেই সরকারই যখন আবার ঠিকানার অজুহাতে ভোটাধিকার খর্ব করে, তখন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে ‘হেনস্তা’ করার আহ্বান ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে সমতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী।
এক প্রাক্তন নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ভোটার তালিকা সংশোধন প্রশাসনিক বিষয় হলেও, রাজনৈতিক ভাষ্য যদি ভয় ও বৈষম্য তৈরি করে, তাহলে প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।”
আসামে আজ প্রশ্ন শুধু ভোটার তালিকা বা উচ্ছেদ অভিযান নয়—প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো জনগোষ্ঠীকে কি রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে শত্রুতে পরিণত করা যায়?
মিনারা বেগমদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়া শুধু ভোটাধিকার কাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি তাদের নাগরিক পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0