নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে ‘শিশু প্রজনন খামার’ গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এপস্টিন

শিশু প্রজনন খামার

Feb 10, 2026 - 13:36
 0  3
নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে ‘শিশু প্রজনন খামার’ গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এপস্টিন
জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল / ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনঃ  যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃত্যুর পরও একের পর এক নথি, সাক্ষ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর জীবনের এমন সব দিক, যা শুধু অপরাধ নয়—মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

সেই অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলোর একটি হলো—নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে বহু সন্তানের জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে একটি বিশেষ মানবগোষ্ঠী তৈরি করার পরিকল্পনা। এপস্টিন চেয়েছিলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মে তাঁর ডিএনএ ছড়িয়ে দিতে।

নিউ মেক্সিকোর ‘বেবি র‍্যাঞ্চ’ পরিকল্পনা

নিউইয়র্ক টাইমস–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, এপস্টিন বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞানী, ধনকুবের ও প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে তাঁর এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের সান্তা ফে শহরের কাছে অবস্থিত তাঁর বিশাল ‘জোরো র‍্যাঞ্চ’-এ নারীদের গর্ভধারণ করানো হবে—এবং একসঙ্গে বহু সন্তানের জন্ম হবে।

যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে এই পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন, তাঁরা এটিকে ‘বেবি র‍্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’ বলে অভিহিত করেন। যদিও এই পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হয়েছিল কি না, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নিজেকে বড় করে তোলার প্রবণতা

তদন্তকারী ও সাংবাদিকেরা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন, এপস্টিন প্রায়ই নিজের আর্থিক সামর্থ্য, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং প্রভাবশালী যোগাযোগ নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করতেন। তিনি বহু ক্ষেত্রেই তাঁর গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও সামাজিক যোগাযোগ সম্পর্কে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করতেন। তবুও বিপুল অর্থ ও কৌশলী সামাজিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবশালী মহলে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।

বিজ্ঞানী মহলে অনুপ্রবেশ

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এপস্টিন একই কৌশল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী মহলেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল—

  • নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-মান

  • তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

  • বিবর্তনবিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গুল্ড

  • হার্ভার্ডের অধ্যাপক ও স্নায়ুবিজ্ঞানী জর্জ এম. চার্চ

এপস্টিন বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সম্মেলন ও গবেষণার অর্থায়ন করতেন। কখনো কখনো তিনি নিজেই অনানুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক সভার আয়োজন করতেন—যেখানে বিলাসবহুল পরিবেশে গবেষণা ও তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা চলত। অনেক বিজ্ঞানী পরে স্বীকার করেন, গবেষণার তহবিল পাওয়ার আশায় তাঁরা এপস্টিনের অপরাধমূলক অতীত উপেক্ষা করেছিলেন।

হার্ভার্ড, অনুদান ও বিলাসী সম্মেলন

এপস্টিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Evolutionary Dynamics Program–এ প্রায় ৬৫ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। তাঁর অর্থায়নে আয়োজিত সম্মেলনগুলোর অনেকগুলো অনুষ্ঠিত হতো যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসে। সেখানে অতিথিদের চার্টার্ড বিমানে আনা হতো এবং তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে বিলাসী বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত। একবার স্টিফেন হকিংসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এপস্টিনের চার্টার্ড সাবমেরিনেও অংশ নেন—যা পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।

মতবিরোধে বাদ পড়া বিজ্ঞানী

হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার জানিয়েছেন, এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এপস্টিন দরিদ্র দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তার বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি ছিল, এতে জনসংখ্যা বাড়বে। পিঙ্কার এই যুক্তির বিরোধিতা করলে এপস্টিন অসন্তুষ্ট হন। পরে পিঙ্কার জানতে পারেন, তাঁকে আর এপস্টিন–আয়োজিত সভায় ডাকা হবে না।

ইউজেনিক্সের ছায়া ও স্পার্ম ব্যাংকের অনুপ্রেরণা

এপস্টিন ‘Repository for Germinal Choice’ নামের একটি বিতর্কিত স্পার্ম ব্যাংক থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল নোবেলজয়ীদের শুক্রাণু সংরক্ষণ, এই বিশ্বাস থেকে যে “মেধাবী জিন মানবজাতিকে উন্নত করবে”। এই প্রতিষ্ঠান ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে মাত্র একজন নোবেলজয়ী শুক্রাণু দান করেছিলেন।

দেহ সংরক্ষণ ও ‘ক্রায়োনিকস’

এপস্টিন কেবল সন্তান উৎপাদনের কথাই বলেননি; তিনি নিজের দেহ সংরক্ষণের ইচ্ছার কথাও প্রকাশ্যে বলতেন। তাঁর এক সহযোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, এপস্টিন ‘ক্রায়োনিকস’—মৃত্যুর পর দেহ হিমায়িত করে ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের ধারণা—নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি চাইতেন, তাঁর মাথা ও যৌনাঙ্গ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হোক।

সন্তান থাকার অভিযোগ ও অজানা সত্য

এপস্টিনের কোনো সন্তান ছিল কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সাম্প্রতিক সময়ে যে নথিগুলো প্রকাশ করেছে, সেগুলোতে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি হয়তো সন্তানের বাবা ছিলেন।

একটি ডায়েরিতে এক নারী লিখেছেন, তিনি ২০০২ সালের দিকে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। তাঁর দাবি, জন্মের পরপরই শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেন এপস্টিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। এই অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই হয়নি, এবং শিশুটির ভাগ্য অজানা।

জেফরি এপস্টিনের ‘বেবি র‍্যাঞ্চ’ ভাবনা কেবল একজন অপরাধীর বিকৃত কল্পনা নয়। এটি ক্ষমতা, অর্থ, বিজ্ঞান এবং নৈতিকতার সীমারেখা মুছে যাওয়ার এক ভয়ংকর উদাহরণ। তার মৃত্যু রহস্যের অবসান ঘটালেও, তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো আজও জীবিত—আর সেগুলোর উত্তর খোঁজা এখনো মানবসমাজের দায়িত্ব।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0