একাত্তরে যুদ্ধবন্দি ৯৩ হাজার পাকিস্তানি কীভাবে দেশে ফেরত গিয়েছিল, কেন বিচার হলো না?

কেন বিচার হলো না?

Mar 27, 2026 - 18:00
 0  3
একাত্তরে যুদ্ধবন্দি ৯৩ হাজার পাকিস্তানি কীভাবে দেশে ফেরত গিয়েছিল, কেন বিচার হলো না?
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমপর্ণনের পর ঢাকার একটি অস্থায়ী বন্দিশিবিরে পাকিস্তানি সেনারা

গাজী আরমানঃ-  ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন অধ্যায় হলো পাকিস্তানের প্রায় ৯৩ হাজার সেনা ও বেসামরিক ব্যক্তির আত্মসমর্পণ এবং পরবর্তীতে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় সংখ্যক যুদ্ধবন্দির ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। এই বিপুল সংখ্যক বন্দিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল জটিল সামরিক, মানবিক এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা, যার সমাধান আসে ধাপে ধাপে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং একসঙ্গে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও কর্মকর্তা যুদ্ধবন্দি হিসেবে ধরা পড়ে।

এই বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার ছিলেন সামরিক, আধাসামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য। বাকি প্রায় ১৩ হাজার ছিলেন বেসামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্য।

আত্মসমর্পণের পর প্রথমে এই বন্দিদের ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়। তবে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক বন্দির নিরাপত্তা, খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

একদিকে দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়া, অন্যদিকে জনগণের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল সংবেদনশীল। ফলে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে জেনেভা কনভেনশন অনুসারে বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের দ্রুত ভারতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ভারত তখন এই যুদ্ধের মিত্র পক্ষ হওয়ায় এবং তাদের পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকায় বন্দিদের সেখানে নেওয়া হয়। স্থল, রেল এবং আকাশপথে ধাপে ধাপে তাদের ভারতের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।

ভারতের কলকাতা, জব্বলপুর, আগ্রা, রাঁচি, বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব যুদ্ধবন্দিকে রাখা হয়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা শিবির ছিল, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কড়া।

নিজের বই The Betrayal of East Pakistan-এ নিয়াজী উল্লেখ করেন, বন্দিশিবিরগুলো কাঁটাতারের বেড়া, প্রহরা টাওয়ার ও সার্চলাইট দিয়ে ঘেরা ছিল। বন্দিদের পালানোর চেষ্টা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হতো।

কিছু বন্দি পালানোর চেষ্টা করলেও অধিকাংশই ব্যর্থ হন। তাদের দৈনন্দিন জীবন ছিল সীমাবদ্ধ, তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী খাবার, চিকিৎসা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল।

এই বিপুল সংখ্যক বন্দি দ্রুতই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়। পাকিস্তান শুরু থেকেই তাদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানাতে থাকে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার না করে বন্দিদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। একই সময়ে পাকিস্তানে আটক থাকা শেখ মুজিবুর রহমান-এর মুক্তির বিষয়টিও বড় শর্ত হিসেবে সামনে আসে।

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবের মুক্তি এবং তার দেশে প্রত্যাবর্তনের পর কূটনৈতিক আলোচনার পথ কিছুটা সহজ হয়।

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সিমলায় একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

এই চুক্তিতে ভারত সম্মত হয় যে, তাদের হেফাজতে থাকা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠানো হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানও বাংলাদেশের প্রতি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় দিল্লি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়—যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ১৯৫ জন ছাড়া বাকি সব বন্দিকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।

এছাড়া পাকিস্তানে আটকে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত আনা এবং বাংলাদেশে থাকা উর্দুভাষী বিহারিদের পুনর্বাসনের বিষয়ও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে বন্দিদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়। বেশিরভাগ বন্দিকে ভারতের ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সেই ১৯৫ জন অভিযুক্তকেও ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে সর্বশেষ বন্দি হিসেবে জেনারেল নিয়াজী পাকিস্তানে ফিরে যান। এর মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

বাংলাদেশ প্রথমে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে চাইলেও আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই তখন বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।

৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির এই ঘটনা শুধু সামরিক ইতিহাস নয়, বরং কূটনীতি, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি দেখায়, যুদ্ধের পরও রাজনৈতিক সমঝোতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে কীভাবে বড় সংকটের সমাধান করা হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই অধ্যায় আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে একইসঙ্গে যুদ্ধ, মানবিকতা ও কূটনীতির এক জটিল কিন্তু শিক্ষণীয় চিত্র ফুটে ওঠে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0