১৫ বছরের শাসনের অবসান
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভেঙে দেয়া হলো, আর মুখ্যমন্ত্রী রইলেন না মমতা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড়। বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি ভারতীয় সংবিধানের ১৭৪ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর ধারার (বি) উপধারা প্রয়োগ করে রাজ্যের সপ্তদশ বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। এর ফলে সাংবিধানিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অবস্থানও কার্যত সমাপ্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
লোকভবনের তরফে প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “ভারতীয় সংবিধানের ১৭৪ অনুচ্ছেদের ২(বি) ধারা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ৭ মে ২০২৬ তারিখ থেকে ভেঙে দেওয়া হল।” এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায়।
গত সোমবার ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। অপরদিকে, টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাম ও কংগ্রেস জোটও উল্লেখযোগ্য ফল করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই বিপুল জয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটতে চলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারকে পরাজিত করে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালেও জয় ধরে রাখলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে জানান, তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন না এবং রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগও করবেন না। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির মধ্যে যোগসাজশে “ভোট লুট” হয়েছে এবং বহু কেন্দ্রে ইভিএম কারচুপি হয়েছে।
এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “আমি হারিনি। মানুষের রায়কে বিকৃত করা হয়েছে। তাই পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না।” এই মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে সাংবিধানিক বিতর্ক শুরু হয়। যদিও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কার্যকালও স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে যায়।
বিধানসভা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব কীভাবে চলবে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। রাজনৈতিক সূত্রে খবর, প্রয়োজনে রাজ্যপাল অস্থায়ী প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যদিও সাংবিধানিকভাবে এটি একটি বিরল পরিস্থিতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ সামনে এসেছে। বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়েছে।
বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৯ মে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড-এ নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী ‘পঁচিশে বৈশাখ’। সেই দিনকে সামনে রেখেই শপথ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গিয়েছে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও বিজেপির অন্দরে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক মহলের মতে, নন্দীগ্রামের এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির মুখ হিসেবে রাজ্যে উঠে এসেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারেও তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ভারসাম্য রক্ষায় একাধিক উপমুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অনেকেই “ঐতিহাসিক পালাবদল” বলে অভিহিত করছেন। দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে এবার প্রথমবার রাজ্যে এককভাবে সরকার গঠনের পথে বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0