শেখ হাসিনাকে ফেরানো আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়: তারেক রহমান
প্রতিশোধ নয়, আইনের শাসনেই সমাধান
গাজী আরমানঃ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিশ্চিত করে সরকার গঠনের পথ সুগম হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে মুখ খুললেন তারেক রহমান। রাজধানীতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন এবং পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। আলোচনায় উঠে আসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারসহ নানা বিষয়।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রশ্নে আইনি প্রক্রিয়ার কথা
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তিনি স্পষ্ট করেন, এ নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী থাকার বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য বা সমঝোতার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সব সমস্যার সমাধানের ভিত্তি। প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির পরিবর্তে আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার প্রশ্নে সরাসরি জবাব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের বিষয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও আইনসভা থেকে পৃথক রাখার নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকার এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে না।
তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চালু থাকবে কি না—এ প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি।
ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: ‘সবার জন্য সমান নীতি’
ভারতীয় সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা উঠে আসে। তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে সমান নীতি অনুসরণ করা হবে। কোনো একক দেশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার কথা জানান তিনি।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যোগ করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বার্থের ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং কৌশলগত স্বশাসনের ভিত্তিতেই সম্পর্ক পরিচালিত হবে।
চীনা সাংবাদিকদের প্রশ্নে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জানানো হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনগণের জন্য যা উপকারী হবে, সেই বিবেচনাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শান্তিপূর্ণ উদযাপনের আহ্বান
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দলীয় নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে কারণেই সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিজয় উদযাপন করা হয়েছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রার্থনার মাধ্যমে।
দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি। অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে সতর্ক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
অর্থনীতি ও নির্বাচনী অঙ্গীকার
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ৩১ দফা পরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিগত সরকারের আমলে অর্থনৈতিক লুটপাট ও অর্থপাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে দলীয় নেতারা বলেন, ইশতেহার অনুযায়ী সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না বলেও জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ পাবে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান
নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি বা বিরোধ যেন প্রতিশোধের রাজনীতিতে রূপ না নেয়—এ ব্যাপারে সকল পক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ও সীমিত প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে বারবারই উঠে আসে একটি মূল বার্তা—আইনের শাসন, সমান বৈদেশিক নীতি এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নতুন সরকার দেশ পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0