ভোটের পর যেভাবে তৈরি হয় ফলাফল
চাইলেই কী ফল পরিবর্তন করা যায়?
বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট। একই দিনে দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট গ্রহণের কারণে ফলাফল প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সাধারণত দেশে ভোটগ্রহণ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। তবে এবার গণভোট যুক্ত হওয়ায় সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। ফলে ভোট শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায় এবং চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের পরও কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত থাকলে তাদের ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট চলবে।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের সাদা ব্যালট এবং গণভোটের গোলাপি ব্যালট—এই দুই ধরনের ব্যালট আলাদাভাবে গণনা করতে হবে। এছাড়া এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটার এবং দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এসব ব্যালটও পৃথকভাবে গণনায় যুক্ত করতে হবে।
তিনশো আসনের সাধারণ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট এবং গণভোটের ফল আলাদাভাবে গণনা ও প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক ইসি কর্মকর্তা জেসমিন টুলীর মতে, দুটি ব্যালট থাকায় সময় কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আলাদা টিম গঠন করে একসঙ্গে গণনা করলে খুব বেশি বিলম্ব হওয়ার কথা নয়।
ভোটগ্রহণ শেষ হলে প্রতিটি কক্ষের ব্যালট বাক্স প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের সামনে সিলগালা করবেন প্রিসাইডিং বা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। এরপর নির্ধারিত গণনা কক্ষে বাক্সগুলো নেওয়া হবে। সেখানে প্রার্থীদের এজেন্ট, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে বাক্স খোলা হবে এবং লক নম্বর যাচাই করা হবে।
ব্যালট পেপার মেঝেতে ঢেলে প্রথমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে। ছেঁড়া, ভুলভাবে সিল দেওয়া বা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। এরপর প্রতীকভিত্তিক ভোট গণনা করা হবে। একইভাবে গণভোটের ব্যালট ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’—দুই ভাগে ভাগ করে গণনা করা হবে।
গণনা শেষে নির্ধারিত ১৬ নম্বর ফরমে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল শিট প্রস্তুত করা হবে। এতে প্রার্থীদের নাম, প্রাপ্ত ভোট, বাতিল ভোট ও মোট ভোটের সংখ্যা অঙ্ক ও কথায় লিখতে হবে। কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
ফলাফল শিটে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হবে। এরপর সাতটি কপি তৈরি করা হবে। একটি কপি কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে টানানো হবে, কিছু কপি সিলগালা করে পাঠানো হবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং একটি কপি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। প্রার্থীদের এজেন্টরা চাইলে কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় ফলাফল নিয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাবেন। সেখানে ফলাফল যাচাই করে কন্ট্রোল রুম থেকে মাইকে ঘোষণা করা হবে। পরে ফলাফল স্ক্যান করে ইসির রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরএমএস)-এ আপলোড করা হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা কেন্দ্রভিত্তিক ফলের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালট যোগ করে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবেন। পোস্টাল ব্যালট খোলার সময়ও প্রার্থীদের এজেন্ট উপস্থিত থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রেই প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ফল গণনা ও ঘোষণা করা হয়। একই ফলাফল কন্ট্রোল রুম ও ইসির সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। ফলে কোনো একটি জায়গা থেকে ফল পরিবর্তন করা সহজ নয়; পরিবর্তন করতে হলে সব জায়গায় তা মিলিয়ে বদলাতে হবে।
তবে অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে আলোচিত হয়। আবার বিভিন্ন সময়ে এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা সহিংসতার কারণে কেন্দ্র স্থগিত বা ভোট বাতিলের নজির রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো স্থগিত কেন্দ্রের ভোট ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলে সেখানে পুনরায় ভোট নিয়ে পরে ফল ঘোষণা করা হয়। আর ফলাফলে প্রভাব না ফেললে পুনঃভোটের প্রয়োজন পড়ে না।
কোনো প্রার্থী ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানালে নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনর্গণনার আবেদন করতে পারেন। কমিশন অনুমোদন দিলে তবেই পুনর্গণনা হবে। এছাড়া নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলাও করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, একযোগে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের কারণে এবারের ভোটগ্রহণ ও ফল প্রকাশ প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল ও সময়সাপেক্ষ হলেও, নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা হলে ফল পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0