প্রথমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জামায়াতের আমির; শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি
মহান একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের স্মরণে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তিনি ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। রাষ্ট্রপতি প্রস্থান করার পর রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সবাই ভাষা আন্দোলনের শহীদ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের শহীদ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলনে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। একইসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর জন্যও দোয়া করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে রাষ্ট্রীয়ভাবে, পরে দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে এবং শেষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পৃথকভাবে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান।
এবারের আয়োজনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—সাধারণত রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে আগে শহীদ মিনারে উপস্থিত থাকেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এবার রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে চলে যাওয়ার পর সেখানে এসে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমবার জামায়াত আমিরের শ্রদ্ধা নিবেদন
তিন বাহিনী প্রধানের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনারে যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির শফিকুর রহমান। তার নেতৃত্বে জামায়াত-সমর্থিত ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং মোনাজাতে অংশ নেন।
এবারই প্রথম জামায়াতের কোনো আমির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে এটি তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তিনি ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জামায়াত নেতারা আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত করেন।
সাধারণ মানুষের ঢল, কিছু উত্তেজনা
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তবে জাতীয় পার্টির একদল নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে শহীদ মিনারে প্রবেশ করতে গেলে একটি রাজনৈতিক দলের একটি ইউনিটের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন বলে জানা যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
কঠোর নিরাপত্তা ও সারাদেশে কর্মসূচি
একুশকে ঘিরে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নগরজুড়ে ছিল সিসিটিভি নজরদারি ও অতিরিক্ত টহল।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের সব জেলা ও উপজেলাতেও স্থানীয় শহীদ মিনারে রাত ১২টা ১ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রভাতফেরি, কালো ব্যাজ ধারণ এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার মাধ্যমে ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হয়।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধু উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থীরা। পুলিশ গুলিতে শহীদ হন আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুল জব্বারসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির পথে এগোয়।
বাংলাদেশে দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। পরে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করলে একুশের তাৎপর্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
মহান একুশ তাই শুধু ভাষার অধিকার আদায়ের স্মারক নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, গণতান্ত্রিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনেরও প্রতীক—যার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নত হয় পুরো জাতি।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0