আত্মপ্রশংসা: আত্মিক ক্ষয় ও ইখলাস বিনষ্টের নীরব কারণ

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে ঘোষণা করো না; তিনি ভালো জানেন কে তাকওয়াবান।”

Apr 5, 2026 - 19:49
 0  3
আত্মপ্রশংসা: আত্মিক ক্ষয় ও ইখলাস বিনষ্টের নীরব কারণ
প্রতীকী ছবি

মানুষের স্বভাবগত একটি প্রবণতা হলো নিজের ভালো দিক, অর্জন ও সক্ষমতাকে অন্যের সামনে তুলে ধরা। সুযোগ পেলেই আমরা নিজেদের কাজ, যোগ্যতা ও সাফল্যের গল্পে মেতে উঠি। এই প্রবণতা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে আত্মপ্রশংসায় রূপ নেয়, যা মানুষের অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে দেয়। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং অনেক সময় ধার্মিক ও নেককার পরিচিত ব্যক্তির মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যায়, যা ইখলাস বা নিষ্ঠার জন্য বড় হুমকি।

ইসলাম আত্মপ্রশংসাকে কখনোই উৎসাহ দেয় না। বরং এটি এমন একটি বিষয়, যা মানুষের আমলকে নিঃশেষ করে দিতে পারে যদি তা অহংকার বা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে হয়। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা বা মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য নিজেকে বড় করে দেখানো—এটি একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে ঘোষণা করো না; তিনি ভালো জানেন কে তাকওয়াবান।” (সুরা নাজম, আয়াত : ৩২)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে বলে দেয়, প্রকৃত মূল্যায়ন মানুষের নিজের মুখে নয়, বরং আল্লাহর জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্ম-অহংকারকে এমন এক ভয়াবহ রোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা আমল ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, “আমি কি তোমাদের জন্য এমন জিনিসের ভয় করব না, যা গুনাহ থেকেও বড়? তা হলো আত্মগর্ব ও অহংকার।” (সহিহুত তারগিব, হাদিস : ২৯২১)

এটি আমাদের শেখায়, বাহ্যিক গুনাহের পাশাপাশি অন্তরের রোগও সমানভাবে ভয়াবহ।

একটি ঘটনা থেকে আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি। মুহাম্মাদ ইবনে আমর (রহ.) থেকে বর্ণিত, জয়নব বিনতে আবি সালামা (রা.)-কে একটি মেয়ের নাম ‘বাররাহ’ রাখা সম্পর্কে জানানো হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা পরিবর্তন করে ‘জয়নাব’ রাখতে বলেন এবং নির্দেশ দেন, “তোমরা নিজেদের পরিশুদ্ধতা ঘোষণা করো না, আল্লাহই জানেন কে প্রকৃত নেককার।” (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫৩)

এখান থেকেও বোঝা যায়, নিজেকে পবিত্র বা শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামে অনুচিত।

আত্মপ্রশংসার ভয়াবহতা শুধু সামাজিক নয়, আখিরাতের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কঠিন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন প্রথম বিচার হবে এমন একজনের, যে শহীদ হয়েছিল। কিন্তু তার নিয়ত বিশুদ্ধ না হওয়ায় আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি এসব করেছিলে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য, এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ১৯০৫)

এমন আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এক ব্যক্তি জিহাদের উদ্দেশ্য ও সুনাম—দুটিই চেয়েছিল। তিনি বলেন, “তার জন্য কিছুই নেই।” (নাসাঈ, হাদিস : ৩১৪০) অর্থাৎ যেসব আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়, তা কবুল হয় না।

এ থেকেই স্পষ্ট হয়, ইখলাস ছাড়া কোনো আমলের মূল্য নেই। মানুষ যা দেখে বা প্রশংসা করে, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিশ্চয়তা নয়।

কুরআনে আরও বলা হয়েছে, “তুমি অহংকারবশে মানুষের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতে অহংকার করে চলো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৮)

এই আয়াত আমাদের বিনয়ী থাকার শিক্ষা দেয়। কারণ অহংকার মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে, আর আত্মপ্রশংসা অন্তরের নরমতা ধ্বংস করে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অর্জন ও ভালো কাজ প্রকাশ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফলে অজান্তেই মানুষ প্রশংসা পাওয়ার মানসিকতায় জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু একজন মুমিনের উচিত নিজের আমলকে গোপন রাখা, যতটা সম্ভব লোক দেখানো থেকে দূরে থাকা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি গোপনে কোনো নেক আমল করতে পারে, তবে সে যেন তা করে।” (সিলসিলা সহিহাহ, হাদিস : ২৩১৩)

এই হাদিস আমাদের জন্য একটি সুন্দর দিকনির্দেশনা—গোপন আমলই বেশি নিরাপদ, বেশি বিশুদ্ধ এবং আল্লাহর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাময়।

সবশেষে বলা যায়, আত্মপ্রশংসা একটি নীরব আত্মিক ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে ইখলাস নষ্ট করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের ভেতর বিনয় তৈরি করা, নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই একমাত্র লক্ষ্য বানানো।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0