কোরআন ও হাদিসের আলোকে জুমার দিনের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব

কোরআন ও হাদিসের আলোকে জুমার দিনের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব

Mar 27, 2026 - 16:56
 0  3
কোরআন ও হাদিসের আলোকে জুমার দিনের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব
প্রতীকী ছবি

 হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং কেনাবেচা ত্যাগ

 করো। এটি তোমাদের জন্য উত্তম—যদি তোমরা বুঝতে।

ইসলামে জুমার দিনকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুরা জুমার এই আয়াতে মুসলিমদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, জুমার দিনে আযান হলে সব দুনিয়াবি কাজ—বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য—স্থগিত রেখে আল্লাহর স্মরণে, অর্থাৎ সালাত ও খুতবার উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

জুমার দিনকে ‘ইয়াওমুল জুমুআ’ বা সমাবেশের দিন বলা হয়। বিভিন্ন সহিহ হাদিসে এ দিনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা আসমান-জমিন ও সমগ্র সৃষ্টি ছয় দিনে সম্পন্ন করেন এবং সেই ছয় দিনের শেষ দিন ছিল জুমা (মুসলিম, হাদিস: ২৭৮৯)। আরও এসেছে, সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনই সর্বোত্তম; এই দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়, জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। এমনকি কিয়ামতও এই দিনেই সংঘটিত হবে (মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)।

এ দিনটির আরেকটি বিশেষ ফজিলত হলো—এর মধ্যে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দার দোয়া কবুল করা হয় (বুখারি, হাদিস: ১৯৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য সপ্তাহে একটি সমাবেশের দিন নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী উম্মতরা তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারেনি। ইহুদিরা শনিবারকে এবং খ্রিস্টানরা রবিবারকে তাদের উপাসনার দিন হিসেবে গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মতকে আল্লাহ তাআলা জুমার দিনের সঠিক হেদায়াত দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আমরা সর্বশেষে এসেও কিয়ামতের দিন অগ্রগামী হব...” (বুখারি: ৮৭৬; মুসলিম: ৮৫৫)।

ইসলামপূর্ব যুগে শুক্রবারকে ‘ইয়াওমে আরূবা’ বলা হতো। পরবর্তীতে কাব ইবনে লুয়াই এই দিনের নাম ‘জুমা’ রাখেন, যার অর্থ একত্রিত হওয়া। এ দিন কুরাইশরা সমবেত হতো এবং ভাষণ দেওয়া হতো। তবে সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী, আদম (আ.)-এর সৃষ্টিকে এই দিনে একত্রিত করার কারণেই ‘জুমা’ নামকরণ হয়েছে।

আয়াতে ব্যবহৃত “نُودِيَ” শব্দের অর্থ আহ্বান করা, যা জুমার খুতবার আযানকে নির্দেশ করে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ, আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর সময়ে জুমার দিনে একটি আযান দেওয়া হতো। পরে উসমান (রা.)-এর যুগে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত আযান চালু করা হয় (বুখারি, হাদিস: ৯১২)।

এ আয়াতের “فَاسْعَوْا” শব্দটি আক্ষরিক অর্থে দৌড়ানো বোঝালেও এখানে উদ্দেশ্য হলো গুরুত্ব ও মনোযোগসহকারে অগ্রসর হওয়া। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাতের জন্য দৌড়ে যেতে নিষেধ করে শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণভাবে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারি: ৬৩৬; মুসলিম: ৬০২)।

এখানে ‘যিকর’ বলতে জুমার সালাত ও খুতবাকে বোঝানো হয়েছে। বহু হাদিসে জুমার দিনে আগেভাগে মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি প্রথম সময়ে মসজিদে উপস্থিত হয়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; পরে যারা আসে তাদের সওয়াব ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে (বুখারি, হাদিস: ৮৮১)।

আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম কল্যাণ কামনা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন” (বুখারি, হাদিস: ৬৪০০)।

সুরা জুমার এই আয়াত মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা বহন করে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—জুমার আযান শোনার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়াবি ব্যস্ততা ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়; বরং মুসলিম সমাজের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0