পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক হামলা: মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে ‘লিথাল স্ট্রাইক’, নিহত ২
প্রশ্নের মুখে মাদকবিরোধী অভিযান
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ছোট মোটরচালিত নৌযানে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়ে দুইজনকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। হামলার সময় নৌযানে থাকা আরও একজন ব্যক্তি জীবিত থাকায় তাকে উদ্ধারে তাৎক্ষণিক তৎপরতা শুরু করা হয়েছে। এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—সমুদ্রপথে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’-এর নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণঘাতী সামরিক কৌশল কতটা স্বচ্ছ ও আইনসম্মত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম তদারককারী সংস্থা ইউএস সাউদার্ন কমান্ড (Southcom) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
‘লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক’-এর দাবি
সাউদার্ন কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, সোমবার পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি নৌযানের ওপর তথাকথিত ‘লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক’ পরিচালনা করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এতে থাকা ব্যক্তিরা ‘মাদক-সন্ত্রাসী’।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ, ছবি, জব্দকৃত মাদক বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়,
“এই অভিযানে দুইজন নিহত হয়েছে এবং একজন ব্যক্তি জীবিত রয়েছে।”
জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধারে কোস্টগার্ড মোতায়েন
হামলার পরপরই জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধারে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশন জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানায় সাউথকম। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয়, নাগরিকত্ব বা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রকাশিত ভিডিও ঘিরে বিতর্ক
ঘটনার পর সাউদার্ন কমান্ড প্রায় ১০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ বা দূরবর্তী অবস্থান থেকে নিশানা করে একটি ছোট নৌযানে আঘাত হানা হয়। আঘাতের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নৌকাটিতে বিস্ফোরণ ঘটে।
বিস্ফোরণের পর নৌকার কিছু অংশ ভেসে থাকতে দেখা গেলেও এর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
প্রশ্নের মুখে মাদকবিরোধী অভিযান
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলা আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইন (UNCLOS) ও মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্ন উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন,
“মাদক পাচার একটি গুরুতর অপরাধ, কিন্তু সন্দেহের ভিত্তিতে সামরিক হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করা হলে তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।”
আগেও ঘটেছে একই ধরনের হামলা
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত সপ্তাহেও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একই ধরনের অভিযানে দুইজন নিহত হওয়ার ঘটনা স্বীকার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই ক্ষেত্রেও মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হলেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে ধারাবাহিক এই ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর সামরিকীকরণ এবং তার মানবিক মূল্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সাম্প্রতিক এই হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক অভিযান নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
প্রমাণ ছাড়াই প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ কি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হচ্ছে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0