পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারিতে শেখ হাসিনার কারাদণ্ড
পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারিতে শেখ হাসিনার কারাদণ্ড
রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট দশ বছরের কারাদণ্ড এবং তার ভাগ্নি, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য টিউলিপ সিদ্দিককে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার একটি বিশেষ আদালত।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালত পৃথক দুটি মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শেখ হাসিনাকে দুটি মামলায় পাঁচ বছর করে মোট দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে টিউলিপ সিদ্দিককে দুটি মামলায় দুই বছর করে মোট চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টিউলিপ সিদ্দিকের বোন আজমিনা হক সিদ্দিক ও ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিককে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত রায়ে সব দণ্ডপ্রাপ্তকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।
পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করা এই দুটি মামলায় ১৮ জন করে মোট ৩৬ জন আসামি ছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলম বিচার চলাকালে গ্রেপ্তার ছিলেন। রায়ের সময় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে দুটি মামলায় এক বছর করে মোট দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
শেখ হাসিনা, টিউলিপ সিদ্দিকসহ অন্য আসামিদের পলাতক দেখিয়ে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। ফলে তারা নিজেদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পাননি। অভিযোগে কী বলা হয়েছে মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা পরস্পর যোগসাজশে রাজধানীতে বাড়ি বা ফ্ল্যাটসহ আবাসন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করেন। এর মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রভাবিত করেন।
এর ফলেই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের একটি নির্দিষ্ট সেক্টরে ১০ কাঠা করে একাধিক প্লট নিজেদের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, নিজেদের অবৈধভাবে লাভবান করা এবং অন্যদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই প্লট বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুদকের মামলায় বলা হয়, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে প্রভাব খাটান। যদিও তিনি নিজ নামে কোনো প্লট নেননি, তবে তার মা, ভাই ও বোনকে প্লট পাইয়ে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
আদালত মনে করেন, সরাসরি প্লট গ্রহণ না করলেও প্রভাব বিস্তার এবং যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্নীতিতে অংশগ্রহণ প্রমাণিত হয়েছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তাও দণ্ডিত এই মামলায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক সাবেক মন্ত্রী, সচিব, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, সরকারি আবাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ বা সুবিধাভোগ নিশ্চিত করা গুরুতর অপরাধ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা আইনজ্ঞদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন সাজা বিচার ব্যবস্থার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দেওয়া এই রায় ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0