ইরানের পারমাণবিক আলোচনার মধ্যেই হোয়াইট হাউজে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর সফর

Feb 11, 2026 - 16:42
 0  4
ইরানের পারমাণবিক আলোচনার মধ্যেই হোয়াইট হাউজে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর ষষ্ঠবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী (ফাইল ছবি)

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রক্সি গোষ্ঠীর সমর্থন বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চাপ দেবেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই বুধবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরানের প্রভাবশালী প্রক্সি গোষ্ঠী হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়গুলো তীব্রভাবে আলোচনায় রয়েছে।

নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ট্রাম্পকে এই আলোচনার নীতিমালা ও বিষয়বস্তুর বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানাবেন। তার দাবি, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা এবং ইরানের প্রক্সি সংগঠনগুলোর প্রতি সহায়তা বন্ধ করাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন তিনি।

ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করবে না। অন্যদিকে ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই সফরটি ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকা সময়ে নেতানিয়াহুর ষষ্ঠবারের মার্কিন সফর। কোনো অন্য বিশ্বনেতার তুলনায় এটি সবচেয়ে বেশি। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, ইরান ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি এবং এই অঞ্চলে তেহরানের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি বিশ্বাস করেন যে আলোচনায় অবশ্যই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রেক্ষাপট রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠানোর বিষয়ে তারা “চিন্তাভাবনা” করছে। এর আগে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠার পর ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন এবং সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। সেই কারণে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল।

ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরান “চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী” এবং কূটনৈতিক সমাধান এখনো সম্ভব। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যদি চুক্তি সফল না হয়, তবে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার ইসরায়েলের আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতানিয়াহু নিজ দেশের অতি-ডানপন্থী মিত্রদের চাপের মুখে রয়েছেন। তাই তিনি ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক ব্যবহার করে এমন একটি চুক্তির দাবি করছেন যা ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর করবে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান বাইম্যান মনে করেন, ইসরায়েল উদ্বিগ্ন যে ট্রাম্প তাড়াহুড়ো করে এমন একটি চুক্তিতে সম্মত হতে পারেন যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রক্সি সমর্থনকে সীমিত করবে না, অথবা পারমাণবিক কর্মসূচি আংশিকভাবে চালিয়ে যেতে দেবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প “নির্দিষ্ট ফলাফলের চেয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতেই বেশি আগ্রহী”—এটাই মিত্রদের আশঙ্কার কারণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছর ব্যাপক বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ১২ দিনের বিমান অভিযানের পর ইরানি শাসনব্যবস্থা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক মোহাম্মদ হাফেজ বলেন, “বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থা সত্যিই দুর্বল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে তাদের হাতে সমস্ত কার্ড রয়েছে এবং এখন তারা সর্বোচ্চ দাবিগুলো করতে পারে।”

নেতানিয়াহুর এই সফর গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের আলোচনা চলাকালীন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যার মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই সংঘর্ষে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় বিপুল প্রাণহানি এবং ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য উঠে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ কার্যকর হলেও পরবর্তী পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়া—এসব ইস্যু এখনও মুলতুবি রয়েছে। গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের পুনর্গঠন—এগুলো দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় প্রধান অড়চান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, “ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর কেউ ছিল না।” তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসন গাজা শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করতে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 1
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0