২০২৫ সালে ৪০১ রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ নিহত
২০২৫ সালে ৪০১ রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ নিহত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা, অস্ত্রের অবাধ বিস্তার এবং ‘মব’ সংস্কৃতির বিস্তার আসন্ন নির্বাচনকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সোমবার প্রকাশিত টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০২ জন। একই সময়ে বিভিন্ন থানা ও সরকারি হেফাজত থেকে এক হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এসব কারণে সহিংসতার মাত্রা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি দ্রুত মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ১২ই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা দুর্বলতার দিক তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা, নেতাকর্মীদের হেনস্থা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াতেও আইনি নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে টিআইবি। গ্রেপ্তার ও রিমান্ড ব্যবস্থায় পুরনো বিতর্কিত ধারা বহাল থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অযৌক্তিক মামলা দায়ের, বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটক রাখা, জামিনযোগ্য মামলায় জামিন না দেওয়া এবং আইন প্রয়োগে সরকারি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে এসেছে। এমনকি সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যাকাণ্ডের মামলায় প্রকৃত অপরাধীর পরিবর্তে অন্যদের আসামি করার নজিরও রয়েছে বলে জানানো হয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বা ‘মব’ সহিংসতা। গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দাবি আদায়ে সাফল্যও মিলছে।
এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কৌশল ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি। কোথাও কোথাও নিষ্ক্রিয়তা এবং তোষণমূলক অবস্থানের কারণে কিছু গোষ্ঠী অতি ক্ষমতায়িত হয়ে পড়ছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এছাড়া কারা হেফাজত ও সেনাবাহিনীর হেফাজতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, ঢালাওভাবে মামলা দায়ের এবং তথাকথিত ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’-এর মতো গুরুতর অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে, টিআইবি মনে করছে—আইনের শাসন নিশ্চিত করা, সহিংসতা ও মব সংস্কৃতি দমন এবং নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0