রোজা ভঙ্গের কারণ ও প্রচলিত ভুল ধারণা
কী বলছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা
রমজান মাসে সিয়াম সাধনা মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই রোজার মূল বিধান। তবে রোজা ভঙ্গের কারণ ও এ-সংক্রান্ত নানা প্রচলিত ধারণা নিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি কম নয়। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, রোজা ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ নির্দিষ্ট এবং সীমিত।
যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায়
ইসলামী বিধান অনুযায়ী প্রধানত পাঁচটি কারণে রোজা ভঙ্গ হয়—
১. ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার গ্রহণ করলে
২. ইচ্ছাকৃতভাবে পানি বা পানীয় পান করলে
৩. শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে
৪. মুখভর্তি বমি হলে
৫. রোজা থাকা অবস্থায় দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করলে
রমজানে দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকার ফলে শরীরে বিভিন্ন শারীরিক প্রভাব পড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. শামছুল আলম বলেন, রক্তপাত বা অতিরিক্ত বমির মতো পরিস্থিতিতে রোজাদার শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। এ কারণেই এসব বিষয়ে শরিয়তে ছাড় বা রোজা ভঙ্গের বিধান রয়েছে।
রোজা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
রোজা ভঙ্গের নির্দিষ্ট কারণ থাকলেও সমাজে আরও কিছু বিষয়কে ভুলভাবে রোজা ভঙ্গের কারণ হিসেবে ধরা হয়। অধ্যাপক শামছুল আলমের মতে, এসব ধারণা মূলত অজ্ঞতা ও অপূর্ণ জ্ঞানের ফল।
মুখের লালা গিলে ফেললে রোজা ভাঙে?
অনেকে মনে করেন, নিজের মুখের লালা গিলে ফেললে রোজা নষ্ট হয়ে যায়। এ ধারণাকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক উপাদান পেটে গেলে রোজা ভাঙে না। তবে অন্য কারও লালা মুখে গেলে রোজা থাকবে না। অর্থাৎ রোজা রেখে চুম্বন থেকে বিরত থাকতে হবে।
দাঁত ব্রাশ করা যাবে না?
দীর্ঘ সময় দাঁত পরিষ্কার না করলে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, রোজা রেখে দাঁত ব্রাশ করা নিষিদ্ধ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সতর্কতার সঙ্গে ব্রাশ করলে রোজার ক্ষতি হয় না। কেবল টুথপেস্ট গলায় চলে গেলে তা অপছন্দনীয় (মাকরূহ) হতে পারে। তাই সাহরির আগে ব্রাশ করাই উত্তম।
নখ, চুল বা দাড়ি কাটা নিষেধ?
রোজা রেখে নখ, চুল বা দাড়ি কাটা যাবে না—এমন ধারণাও প্রচলিত। অথচ এ বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কেবল শেভ করার সময় রক্তপাত যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রমজান মাসে দাম্পত্য সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ?
অনেকে মনে করেন, পুরো রমজান মাসেই দাম্পত্য সম্পর্ক হারাম। বাস্তবে দিনের বেলা রোজা থাকা অবস্থায় সম্পর্ক স্থাপন করলে রোজা ভেঙে যায়। কিন্তু ইফতারের পর থেকে সাহরি পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না?
আতর ব্যবহার সুন্নত এবং এতে রোজা নষ্ট হয় না। পারফিউম ব্যবহার নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেও সাধারণভাবে এটি রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।
ভুলে খেয়ে ফেললে কী হবে?
অনেক সময় ভুলে কেউ পানি পান বা খাবার খেয়ে ফেলতে পারেন। অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলে রোজা ভেঙে যায় না। তবে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার ফেলে দিতে হবে এবং আর গিলে ফেলা যাবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে খেলে তবেই রোজা ভঙ্গ হবে।
ওষুধ সেবন
যেসব ওষুধ গিলে খেতে হয়, তা রোজা অবস্থায় গ্রহণ করা যাবে না। তবে চোখ বা নাকে ড্রপ ব্যবহার করলে সমস্যা নেই। জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষার প্রয়োজন হলে ইসলামে ছাড় রয়েছে। ইনসুলিন বা ইনজেকশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ধূমপান
রোজা রেখে ধূমপান করলে রোজা ভেঙে যায়। তাছাড়া ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও নিরুৎসাহিত।
রান্নার সময় স্বাদ গ্রহণ
রান্নার সময় লবণ বা ঝাল পরীক্ষা করার জন্য অল্প খাবার জিহ্বায় লাগিয়ে পরে ফেলে দিলে রোজা নষ্ট হয় না। তবে গিলে ফেলা যাবে না।
কারা রোজা রাখবে?
ইসলামে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ ব্যক্তির ওপর রোজা ফরজ। শিশু, শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি, ভ্রমণকারী, দুর্বল মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা ও দুগ্ধদানকারী নারীর জন্য রোজা আবশ্যিক নয়।
শিশুরা অনেক সময় উৎসাহে রোজা রাখলেও তাদের ওপর এটি বাধ্যতামূলক নয়। সাবালক হওয়ার পর থেকেই রোজা ফরজ হয়।
রমজানকে ঘিরে নানা সংস্কৃতি ও সামাজিক চর্চা থাকলেও, ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়ানো যায় এবং ইবাদত সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0