নির্বাচনী প্রচারণায় AI কন্টেন্ট: ভোটারদের বিভ্রান্তির নতুন অস্ত্র

ভোটারদের বিভ্রান্তির নতুন অস্ত্র!

Feb 3, 2026 - 13:33
 0  2
নির্বাচনী প্রচারণায়  AI কন্টেন্ট: ভোটারদের বিভ্রান্তির নতুন অস্ত্র
এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এআই দিয়ে তৈরি অসংখ্য ভিডিও ও ছবি, যা একদিকে রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ ও বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন আচরণবিধিতে এআই সংক্রান্ত নীতিমালাও যুক্ত করে। তবে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ও বিভ্রান্তিকর এআই কন্টেন্টের বিস্তার ততই বাড়ছে।

এতে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্ট শনাক্ত করার মতো সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ভুয়া বা বিকৃত তথ্যসমৃদ্ধ এসব ভিডিও সহজেই ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ৮০০টির বেশি এআই নির্মিত ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব ভিডিওতে সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর বড় একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে তৈরি করা। এআই কন্টেন্টের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তার একটি উদাহরণ হলো— বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সাহায্যের জন্য বিকাশ নম্বর চাইতে দেখা যায় এমন একটি ভুয়া ভিডিও। এআই দিয়ে তৈরি ওই ভিডিওটি একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ তা দেখেছে।

 ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতপন্থী এআই ভিডিওগুলোতে বিএনপিকে চাঁদাবাজ ও প্রতারক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনে ছড়ানো ভিডিওগুলোতে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা তুলে ধরা হচ্ছে। এতে নির্বাচনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি আরও তীব্র হচ্ছে। নির্বাচনী আচরণবিধির ১৬(ছ) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, চরিত্র হনন বা মানহানির উদ্দেশ্যে এআইসহ যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা বা বিদ্বেষমূলক কন্টেন্ট প্রচার করা নিষিদ্ধ।

 যদিও প্রচারণামূলক এআই কন্টেন্ট তৈরিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে আক্রমণাত্মক ও বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী জানান, নির্বাচনী এআই ভিডিওগুলোর মধ্যে প্রচারণামূলক কন্টেন্টের পাশাপাশি বিদ্বেষপূর্ণ ও ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক উপাদানও রয়েছে। তার ভাষায়, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলেছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউএনডিপির সহায়তায় এআই ব্যবহার করে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী কন্টেন্ট শনাক্তের একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে কমিশনও স্বীকার করছে, সীমিত সক্ষমতার কারণে শুধুমাত্র গুরুতর ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপ কন্টেন্টগুলোর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি কম খরচে প্রচারণার সুযোগ তৈরি করায় অনেক প্রার্থীর জন্য এটি ইতিবাচক দিকও বয়ে এনেছে। তবে এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্টে স্পষ্ট লেবেলিং নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলছেন, ক্ষতিকর কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত না হয়।

সঠিকভাবে কোন কন্টেন্ট ক্ষতিকর আর কোনটি বৈধ সমালোচনা—তা নির্ধারণের দক্ষতা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0