পিলখানার রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি: কিশোরীর চোখে দেখা ৩৬ ঘণ্টার বিভীষিকা
বিদ্রোহ করা হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমার বাবা কী অন্যায় করেছিলেন?
আমি এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না, আমরা কেউই এটাকে বিদ্রোহ বলতে চাই না। আমি এটাকে কারনেজ বলতে চাই। আমি এটাকে ম্যাসাকার বলতে চাই।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানা এলাকায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)-এর সদরদপ্তরে সংঘটিত হয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। দুই দিনের ওই ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা-সহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খান।
সেই রক্তাক্ত সময়ে সদরদপ্তরের ভেতরে অবরুদ্ধ ছিলেন বহু সামরিক পরিবারের সদস্য। তাদেরই একজন ছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্রী ফাবলিহা বুশরা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি হারান তার বাবাকে। একই সঙ্গে মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে কোয়ার্টার গার্ডে ৩৬ ঘণ্টা জিম্মি অবস্থায় কাটাতে হয় তাকে।
গোলাগুলির শব্দে শুরু
সকালের নাস্তার টেবিলে বসেই প্রথম গুলির শব্দ শোনেন বুশরা। তাদের বাসা ছিল তৎকালীন মহাপরিচালকের বাসভবনের পাশেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়—অবিরাম গুলি, আগুন, আতঙ্ক। একটি বুলেট তাদের বাসার জানালার গ্রিল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। নিচে দাঁড়ানো গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি জানান, সশস্ত্র জওয়ানরা অনেকেই মুখ ঢেকে ছিল। তাদের আচরণ ছিল আক্রমণাত্মক ও উন্মত্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের সদস্যদের ঘর থেকে বের করে কোয়ার্টার গার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।
কোয়ার্টার গার্ডের ভয়াল অভিজ্ঞতা
একটি কক্ষে গাদাগাদি করে ৭০-৮০ জন নারী ও শিশুকে আটকে রাখা হয়।
বুশরা বলেন, "আমি জানতাম না কোয়ার্টার গার্ড কী জিনিস বা সেখানে কী করা হয়। আমাদের আগে পুরাতন ডিজি কোয়ার্টার থেকে কিছু ফ্যামিলি নিয়ে আসা হয়েছিল। আমাদের সামনে লাইন ধরে ধরে রুমটার মধ্যে যখন সবাইকে ঢুকাচ্ছিল।"
"সবচেয়ে বীভৎস যেটা লাগছিল যে ওনারা বেধড়কভাবে অফিসারের মিসেস যারা, ইভেন মা এবং সন্তানদের পেটাচ্ছিল। তখন আমার পেছনে একটা লাথি লাগে। আমার কানের পেছনে বন্দুকের বাঁট দিয়ে একটা আঘাত করে।"
বুশরা জানান, একটা রুমে ৭০/৮০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। এসময় বিডিআর জওয়ানরা উল্লাস করছিল এবং কে কয়জনকে মেরেছে সেটি জানান দিচ্ছিল। জিম্মি অবস্থায় অল্প বয়সে নৃশংস ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছিলেন কিশোরী বুশরা।
"একজন ধুপী ছিলেন উনি একজন অফিসারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উনি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে যান। আমরা বাইরে বসে দেখছিলাম যে, তার ওপর জাস্ট ২০-২৫ জন লোক ঝাঁপিয়ে পড়লো। এবং তাকে যে যে জিনিস পাচ্ছে তাই দিয়ে পেটাচ্ছে। লোকটার চিৎকার আমি কোনোদিন ভুলবোনা। আমি অনেক রাত ঘুমাতে পারি নাই এই জিনিসটা এক্সপিরিয়েন্স করার পর।"
হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান ও বিচার
এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিডিআর-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বাহিনীর কাঠামো ও শৃঙ্খলায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়।
ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া ছিল দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ। ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও শতাধিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অনেকের সাজা কমানো বা খালাস দেন। মামলাটি এখনো চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেছে এবং এই ট্র্যাজেডি নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন আজও আলোচিত।
মানসিক ক্ষতের দীর্ঘ পথচলা
বাবার মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষা এবং জানাজায় অংশ নেওয়া—এই অভিজ্ঞতা বুশরার জন্য ছিল আরও বেদনাদায়ক। ঘটনার পর দীর্ঘ সাত বছর তাকে মানসিক চিকিৎসা ও থেরাপি নিতে হয়েছে। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ও পড়াশোনায় অনীহা—এসবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে।
পরিস্থিতি ছিল পরিহাসপূর্ণ—যে বাবা পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তারই মেয়েকে ঘুরতে হয়েছে একাধিক মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে।
নয় বছর পরের জীবন
বর্তমানে বুশরা একটি মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। শোকের দিনগুলো তিনি ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে চান—সবার ভিড় কমে গেলে নীরবে বাবার কবরের পাশে সময় কাটান।
২০০৯ সালের ঘটনাকে তিনি ‘বিদ্রোহ’ বলতে নারাজ। তার ভাষায়, ভেতরে যারা ছিলেন তারা কোনো ন্যায়সংগত আন্দোলন দেখেননি; দেখেছেন হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও উল্লাস। তার মতে, এটি ছিল এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ—যার ক্ষত আজও শুকায়নি।
পিলখানার সেই রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি হয়ে আছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং বিচারব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। কিন্তু সবচেয়ে গভীর চিহ্ন রয়ে গেছে সেইসব পরিবারের মনে, যারা এক মুহূর্তে হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জনদের।
তথ্য সূত্রঃ- বিবিসি বাংলা
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0