নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আগ্রহ দেখালে চুক্তিতে প্রস্তুত তেহরান
ওমানে পরোক্ষ বৈঠক, জেনেভায় দ্বিতীয় দফা
যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনায় এগিয়ে আসে, তবে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান প্রস্তুত—এমন বার্তা দিয়েছেন দেশটির এক শীর্ষ কূটনীতিক। তেহরানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বলেছেন, “চুক্তি হবে কি না, তা এখন আমেরিকার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তারা যদি সত্যিই আগ্রহী হয়, আমরা সমঝোতার দিকে এগোতে পারব।”
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা বরাবরই দাবি করে আসছেন যে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে ইরানের অনাগ্রহের কারণে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির পক্ষে থাকলেও ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করা “খুবই কঠিন”।
হামলার হুমকি ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে না এলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ওই দমন-পীড়নে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক স্থাপনা, নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনা-এ হামলা চালায় বলে জানা যায়। এসব স্থাপনাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ওমানে পরোক্ষ বৈঠক, জেনেভায় দ্বিতীয় দফা
ফেব্রুয়ারির শুরুতে উপসাগরীয় দেশ ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাখত-রাভানচি নিশ্চিত করেছেন, দ্বিতীয় দফার আলোচনা মঙ্গলবার জেনেভায় হওয়ার কথা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা মোটামুটি ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হয়েছে, তবে চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। ট্রাম্পও আলোচনাকে “ইতিবাচক” বলে মন্তব্য করেছেন।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ‘রেড লাইন’ বিতর্ক
ইরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
২০১৫ সালের বহুপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ১১ হাজার কেজি ইউরেনিয়াম রাশিয়া-তে পাঠিয়েছিল। তবে ট্রাম্প তিন বছর পর সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। বর্তমানে রাশিয়া আবারও অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরান আগের মতো চারশো কেজির বেশি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাতে রাজি হবে কি না—এ প্রশ্নে তাখত-রাভানচি স্পষ্ট উত্তর দেননি। তিনি বলেন, “আলোচনার প্রক্রিয়ায় কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।”
‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ নয়
ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দাবি ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’—অর্থাৎ ইরান যেন সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে। তবে তেহরান এটিকে তাদের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে। ইরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির আওতায় শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার।
তাখত-রাভানচি বলেন, “শূন্য সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি এখন আর আলোচনার টেবিলে নেই।” যদিও ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সমৃদ্ধকরণ চায় না।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বাইরে
ইরান স্পষ্ট করেছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তারা আলোচনায় বসবে না। এটি ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান দাবি হলেও তেহরান বলছে, আত্মরক্ষার জন্য এসব ক্ষেপণাস্ত্র অপরিহার্য। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, “যখন আমাদের ওপর আক্রমণ হয়, তখন ক্ষেপণাস্ত্রই আমাদের সুরক্ষা দেয়। আত্মরক্ষার সক্ষমতা আমরা কীভাবে ত্যাগ করব?”
সামনে কোন পথ?
ইরানের অন্যতম দাবি ছিল, আলোচনা যেন কেবল পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাখত-রাভানচি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রও এখন এ বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। তবে চুক্তি চূড়ান্ত হবে কি না, তা নির্ভর করছে পারস্পরিক আস্থার ওপর।
এক দশক আগে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ভূমিকা রাখা এই কূটনীতিক এবারও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। তার ভাষায়, “আমরা শুনছি তারা আলোচনায় আগ্রহী—প্রকাশ্যে এবং ওমানের মাধ্যমে গোপন বার্তায়ও তা জানিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সেই আগ্রহ কতটা বাস্তব।”
সব মিলিয়ে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই জটিল সমীকরণের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সমঝোতা না সংঘাত—কোন পথে এগোবে ওয়াশিংটন ও তেহরান, তা নির্ধারণ করবে সামনের কয়েক দফা আলোচনা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0